চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

দৃষ্টিনন্দন শহর গড়তে বাণিজ্যিক মানসিকতাকে দূরে রাখতে হবে

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১:৪০ অপরাহ্ণ

মানুষের ইতিহাস সভ্যতার ইতিহাস, সুন্দরের ইতিহাস। মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দর কিছু করতে চায়। হজরত আদম থেকে যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে স্পষ্ট হবে কীভাবে মানুষ সুন্দরকে চেয়েছে। মানুষের পরিচয় যুদ্ধবিগ্রহ নয়, মানুষের পরিচয় তার সৌন্দর্যের সৃষ্টি।

মানুষ প্রতিনিয়ত তার মানবিক গুণাগুণকে উদযাপন করতে চায়। ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, একটা রক্তের নদী উপর থেকে নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু মানুষ যুদ্ধবিগ্রহকে মনে রাখে না। মানুষ তার সৃষ্টি নিয়ে গর্ব করে। এই রক্তস্নাত নদীর দু’পাড়ে যে ইমারত গড়ে উঠেছে, সেটাই আমাদের শিল্প, সৌন্দর্য। রক্তগঙ্গা আমাদের গৌরবের নয়। এর মধ্যে মানবিকতার কোন ছোঁয়া নেই।

 

বর্তমান সময়ে এসে আমাদের নানাভাবে ভাবতে হচ্ছে সুন্দর করে থাকতে। সুন্দর করে থাকতে হলে যেমন ব্যক্তির রুচির প্রয়োজন আছে, তেমনি সাংস্কৃতিক রুচিবোধ এবং নানা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকারও প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব একটা সংস্কৃতি হয়। প্রত্যেক অঞ্চলেও নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আফ্রিকার দেশগুলো কীভাবে সংস্কৃতির চর্চা করেছে এবং আমাদের দেশে আমরা কীভাবে চর্চা করেছি, সেটা দেখলেই স্বাতন্ত্র্যটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা আমাদের বাড়ির উঠোন সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখি। কারণ আমরা চারপাশটা সুন্দর রাখতে চাই। আমরা সাঁওতালদের তাকালে দেখতে পাবো, তাদের মাটির বাড়ি, অথচ অনেক বেশি সুন্দর। তারা নানারকম আল্পনা নকশা কেটে বাড়ি তৈরি করে।

 

মানুষ সুন্দর করে থাকতে চাই। এটা তার সহজাত প্রবৃত্তি। বর্তমান যুগে এসে বাংলাদেশেসহ সারাবিশে^ জনসংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। ফলে পৃথিবীতে সুন্দর করে থাকা আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে আসছে। তাছাড়া নানারকম ভোগের উপকরণ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিনিয়ত আমরা তা সংগ্রহ করতে চাই। যখন এর চাহিদা শেষ হয়ে যায়, তখন আমরা যত্রতত্র ছুড়ে ফেলে দেই।

 

আমার সাথে চট্টগ্রামের সম্পর্ক ১৯৬৮ সালে। তখন এই শহরটা আমার কাছে অপরূপ মনে হয়েছিল। আমি সিআরবি হয়ে বাটালি হিলসহ বিভিন্ন জায়গায় অনেক বেশি সময় কাটিয়েছি। এই চট্টগ্রামের গল্প শুনতে শুনতে আমি বড় হয়েছি। আমি নিজে যখন আসি, তখন সেই ভাবনাগুলো আমার মাথায় কাজ করেছে। তখন পাহাড়ের পাশে পাশে শহরের মাঝখানে অনেক খাল ছিল। এ বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। এই খালগুলো দিয়ে বর্ষার মৌসুমে পানি নেমে যেতো। জনবসতি বৃদ্ধির কারণে সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। নিচু ভূমিগুলোতে বসতি গড়ে উঠেছে। আগে শহরের পানি সেখানে গিয়ে জমা হতো। এরপর ধীরে ধীরে নদীতে চলে যেতো। এখন বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

 

বিশাল এই চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে মাত্র দুইটা নদী আছে। একটি হালদা, আরেকটি কর্ণফুলী। ঢাকার চারদিকে চারটা নদী ছিল। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও ধলেশ্বরী। এই নদীগুলোর কারণে সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। এখন ঢাকার চারদিকের নদীগুলো দূষিত হয়ে রং পরিবর্তন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সেখানে ব্যাঙাচিও বাঁচতে পারবে না। চট্টগ্রাম শহর সে অর্থে এখনও ঢাকার মতো হয়ে উঠেনি এবং ঢাকার মতো বসতি গড়ে উঠেনি।

 

সারা বাংলাদেশের মানুষকে মনে রাখতে হবে, আমাদের বর্জ্যগুলো যে আমরা ড্রেনে ফেলি সেগুলো খালে যাচ্ছে; সেখান থেকে এগুলো বঙ্গোপসাগরে পড়বে। আমরা যেমন নদীকে নষ্ট করছি, তেমনি সমুদ্রকেও নষ্ট করছি। অর্থনৈতিক কারণে চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা শিল্প গড়ে উঠেছে, এটাকেও নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। এটা আমাদের সমুদ্রকে দূষিত করবে। এই ভাবনাগুলোকে সমাধান করতে চাইলে প্রথমে পরিবেশের যতœ নিতে হবে। তারপর ভাবতে হবে রাস্তাঘাট কীভাবে গড়ে উঠবে। এর জন্যে বিশেষজ্ঞ লোকের দরকার আছে। ভালো হিসাব করতে হবে। যা কিছুই করার পরিকল্পনা করা হোক, সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে করতে হবে।

 

চট্টগ্রাম শহরকে দৃষ্টিনন্দন করতে চাইলে সবাই এ শহরকে ভালোবাসতে হবে, বুঝতে হবে এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে এবং সর্বোপরি বাণিজ্যিক মানসিকতাকে দূরে রাখতে হবে। নানা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের হাতে এর ভাগ্য ছেড়ে দিলে হবে না। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নকশা বাছাই করতে হবে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট