চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এগোতে পারছে না চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১২:২০ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার আগে থেকেই একটা বিভক্তি দেখে আসছি। পাকিস্তান আমলে রাওয়ালপিন্ডির সাথে ঢাকার যে দূরত্ব বা ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার যে দূরত্ব আমরা দেখতাম, সেটা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি চট্টগ্রাম এবং ঢাকার মধ্যে।

 

ডিসি পার্কে একটা বইমেলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে সিআরবিতে বড় ধরনের একটা বইমেলা হচ্ছে, তখন ওখানে ডিসি সাহেবের উদ্যোগে আরেকটা বইমেলা বা চারটা স্টল কেন দেওয়া হলো? এটাও এক ধরনের বিভক্তি।

 

ডিসি হিল পার্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটা আন্দোলন চলে আসছে এবং ডিসি হিল পার্কে যে সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করা হয়েছিল, এটা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন যেটাকে ডিসি পার্ক বলা হচ্ছে, এটা তো নগরীর বাইরে। অনেকে বলতে পারেন শহরটা তো বড় হচ্ছে দিনদিন। কিন্তু উত্তর সলিমপুর ডিসি পার্কে এখনও কমিউনিকেশনের কোন সুবিধা করা হয়নি। যেতে হলে ব্যক্তিগত যানবাহন লাগবে। এসব বিভক্তি আমাদের মাঝে প্রকট হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রশাসনিক বিভক্তি এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

চট্টগ্রামে কিন্তু শুরুতেই সিনেমাটাকে গলা টিপে মারা হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে একটা বিল আনা হয়। তার পূর্ব পর্যন্ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছিল করাচিতে। তখন লাহোরেও ফিল্ম তৈরি হতো মুম্বাইয়ের পাশাপাশি, কিন্তু ওটা প্রাইভেট স্টুডিওগুলোতে হতো। সরকারি দুটো পিএফডিসি (পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) করা হবে বলা হচ্ছিল তখন। একটা করার কথা লাহোরে, আরেকটা করার কথা চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে যেটা হবে সেটার অফিস এবং স্টুডিও হবে পতেঙ্গায়। আর তার আউটডোরের জন্য আলাদা একটা স্টুডিও করা হবে কক্সবাজারে।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তৎকালীন যিনি শিল্পমন্ত্রী ছিলেন, আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উনি বিলটাকে ঘুরিয়ে দেন। উনি তখন গণপরিষদে বিলটা আনেন ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল। সেই বিলে এটা উত্থাপন করা হয় যে এফডিসিটা হবে ঢাকায়। এটার অফিস করা হয় তেজগাঁওয়ে। যেটা ঢাকা থেকে অনেক দূরে ছিল তখন। এখনও সেখানেই আছে। তাই এফডিসি যখন ঢাকায় করা হলো, তখনই চট্টগ্রামের সিনেমাকে গলা টিপে হত্যা করা হলো। অথচ চট্টগ্রামেই এটি হওয়ার কথা ছিল।

 

প্রথম যে ছবি তৈরি হয়েছিল, এটা এফডিসির বাইরে, মুখ ও মুখোশ, সেই ছবির নায়িকা ছিলেন চট্টগ্রামের। পূর্ণিমা সেনগুপ্ত। তাহলে চলচ্চিত্রে শুরু থেকেই চট্টগ্রামের একটা ভূমিকা ছিল। এখান থেকে অনেকেই ফিল্ম ডিরেকশনে গিয়েছেন। মোস্তফা মেহমুদ ছিলেন মিরসরাইয়ের লোক। অনেকগুলো সিনেমা করেছেন তিনি। নায়িকাও আছেন অনেকেই। কবরী আছেন। সেই পূর্ণিমা থেকে শুরু করে শাবানা পর্যন্ত অনেকেই আছেন। ফিল্মের মিউজিক ডিরেকশনে থাকা সত্য সাহাও চট্টগ্রামেরই লোক। প্রথম যে ছবিটা পূর্ব পাকিস্তানে হিট হয়েছিল, সেই ছবিটার প্রডিউসার ছিলেন চট্টগ্রামের, চিত্তরঞ্জন চৌধুরী। নায়িকা কবরীর প্রথম হাজবেন্ড। এছাড়া ডিস্ট্রিবিউশন হাউস ছিল। ওরা বিদেশি ছবি আনতো। ওদের অনেকগুলো সিনেমা হল ছিল।

 

আমাদের পুরো ভারতবর্ষে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট শুরু হয় কলকাতায় ১৯৪৭ সালে। ওটার প্রধান দু’জন উদ্যোক্তা হলেন সত্যজিৎ রায় এবং চিদানন্দ দাশগুপ্ত। চিদানন্দ দাশগুপ্ত কিন্তু চট্টগ্রামের লোক। অপর্ণা সেনের বাবা। সেদিক থেকে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টেও চট্টগ্রামের একটা অবদান আছে। আর আমাদের অনেকেই ফিল্ম সোসাইটির সাথে যুক্ত ছিলেন।

 

তাহলে এখন আমরা পারছি না কেন? কেন নতুনরা এখন এ জগতে এগিয়ে আসছে না? এর প্রধান কারণ হচ্ছে কোন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। আর এফডিসির মতো অত বিশাল স্টুডিওর এখন দরকার নেই। কারণ ঢাকার ধানমন্ডি এবং উত্তরায় প্রচুর ফিল্ম হাউস আছে, শুটিং হাউস বলা হয় এগুলোকে। এখন এফডিসিতে গেলে দেখবেন কোন ছবির শুটিং হয় না, পরিত্যক্ত একরকম। এজন্য ফিল্ম হাউসগুলোই ভালো। হাউসগুলোতে সমস্যা ইক্যুইপমেন্ট আছে এবং সেটও রেডিমেড পাওয়া যায়। এরপর ঢাকায় সিনেমা তৈরি করার জন্য দুটো গ্রাম আছে। একটা হচ্ছে পূবাইলে, আরেকটা হচ্ছে মানিকগঞ্জের ঝিটকা। এ ধরনের কিছু অবশ্য চট্টগ্রামে নেই।

 

আমরা যারা চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র নির্মাতা আছি, আমরা ছবিগুলো বানালে এগুলো ঢাকায় প্রদর্শন করাতে পারি না। আমাদের ছবি নিয়ে কলকাতা বা বাইরের কোথাও গেলে সেখানে অনেকবার শো করতে পারি। কিন্তু ঢাকায় অনেক কষ্ট করে একবার দেখানো যায়। আমরা টেলিভিশনে গিয়েছিলাম। ওনাদেরকে বললাম, ‘আপনারা একটা স্লট করে আমাদের ছবিগুলো মাঝেমধ্যে দেখান।’ ওনারা বললেন, ‘আমাদের এরকম কোন স্কিড নেই।’
চট্টগ্রামে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এ দীনতা দূর করতে হলে সিনেমা তৈরিতে ধনীদের এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকায় কিন্তু অনেকেই টাকা নিয়ে তৈরি আছে সিনেমা বানানোর জন্য। এরকম মানসিকতা চট্টগ্রামে দরকার। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সম্ভবত মিডিয়া বিজনেসটা এখনও বোঝেন না। এখন পর্যন্ত একটা প্রাইভেট টিভি চ্যানেল চট্টগ্রামে চালু হয়নি। একটা প্রচেষ্টা অবশ্য হয়েছিল বিজয় টিভি চালুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু এটা হাইজ্যাক হয়ে গেছে ঢাকায়। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা অন্য ব্যবসা বোঝেন, কিন্তু মিডিয়াও যে একটা ব্যবসা হতে পারে এটা তারা বোঝেন না।

 

প্রচুর প্রডিউসার ছিলেন চট্টগ্রামের যারা সিনেমা হলগুলো চালাতেন, ঢাকায়ও সিনেমা প্রডিউস করতেন। কিন্তু এখন নেই। কারণ তারা মিডিয়ার ওপর কোন গুরুত্ব দেন না। ঢাকায় যিনি প্রথম সিনেপ্লেক্স বানান, তিনি কিন্তু চট্টগ্রামের লোক। এখন মিরসরাইয়ের এমপি। ঢাকায় অনেকগুলো সিনেপ্লেক্স করার পর চট্টগ্রামের চকবাজারে করেছেন। এটা তো উনি প্রথমদিকে করতে পারতেন চট্টগ্রামের একজন লোক হিসেবে।

 

আরেকটা বিষয় হচ্ছে বিটিভি চট্টগ্রামকে আমাদের ছবিগুলো সপ্তাহে অন্তত ত্রিশ মিনিটের একটা স্লট করে হলেও দেখানো দরকার। নাহলে তো চট্টগ্রামে টিভি সেন্টার করার কোন দরকার ছিল না। যদি সেখানে ঢাকার অনুষ্ঠানগুলোই দেখানো হয়। তাই চট্টগ্রামের সিনেমাকে পারফর্ম করার জন্য বিটিভি চট্টগ্রামকে এগিয়ে আসতে হবে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট