চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আমরা তুলে ধরতে পারছি না

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১২:০৬ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামে সংস্কৃতি চর্চার সীমাবদ্ধতা এবং এর থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায় এই নিয়ে আমাদের এখন থেকেই ভাবতে হবে। অভিযোগ থাকবেই। এর মধ্যে থেকে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সত্যিকারের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবান্ধব নগরী রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।

বিগত ৫০ বছরে চট্টগ্রামে শিল্প ও সাহিত্যে অনেক প্রাপ্তি আছে। আবার অনেক দুঃখও আছে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও বইমেলার জন্য আমরা একটা নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করতে পারি নাই। কখনও আউটার স্টেডিয়াম, কখনও শিরীষতলা, কখনও ডিসি পার্ক, কখনও লালদিঘির পাড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা। এরকম একটা অস্থিতিকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এখন যাচ্ছি। আরও দুঃখজনক হলো বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের বইমেলায় কোন সহযোগিতা করে না। এমনকি একটি স্টল দেয়ার দায়িত্ববোধও করেন না। শিল্প সংস্কৃতিটাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক। রাজধানীর বাইরে আমরা যে সামগ্রিক পরিবেশটা তৈরি করেছি। সেটা আগামী প্রজন্মের জন্য কতটুকু সত্যিকারের বাতাবরণ হবে, তা নিয়ে এই গোলটেবিল আলোচনা।

 

সাহিত্য সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কিনা সেটা মুখ্য বিষয়। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও আসলে এটার কি কোন ভিত্তি আছে। বন্দরের সামগ্রিক বাজেটের কতটা সংস্কৃতির উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। বন্দরের আয়ের ন্যূনতম ক্ষুদ্র একটা অংশ সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতায় খরচ করতে হবে, এমন দাবি আমরা কখনও তুলতে পারিনি। শিল্প, সাহিত্য বা, সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে সিডিএ বা সিটি কর্পোরেশনের কোন বাজেট নেই। তবে বিভিন্ন সময় বইমেলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কোন অর্থনৈতিক নীতিমালা নেই। আমাদের সংস্কৃতির জন্য অর্থনৈতিক ব্যাপরটা নিয়ে ভাবতে হবে।

 

কেন্দ্রীয়ভাবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতির জন্য যে ব্যয়টা করা হয়, সেটা খুবই অপ্রতুল। ঢাকার বইমেলায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের লোগো ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় বইমেলা হচ্ছে। কিন্তু সেটাতে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় বা জাতীয় কোন প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করা হয় না। সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায়

 

অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের এই বইমেলায় জাতীয় কোন প্রতিষ্ঠানের কোন ভূমিকা নেই। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত থিয়েটার ইনস্টিটিউটের জন্য সাংস্কৃতিক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ে কোন বরাদ্দ আছে কিনা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সরকারি আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হয় কিনা এসব বিষয় আমরা এখনও জানি না। এই আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আমরা এসব ব্যাপারের একটা দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে।

 

এক সময় চট্টগ্রামের অভিনেত্রীরা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতো। চিত্রালী নামে একটা বিনোদন ম্যাগাজিন ছিল, যাতে চট্টগ্রাম অভিনেত্রী কবরীর ছবি প্রায় সময় ছাপানো হতো। তাদের ছবির পোস্টার টাঙিয়ে রাখা হতো গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন দোকানে। এরপর সেটা ধরে রাখা যায়নি। অথচ চট্টগ্রাম বিত্তবানদের জায়গা। এখানে খুরশীদ মহল, বনানী কমপ্লেক্সের মতো সিনেমা হল তৈরি করা হয়েছিল। দর্শকদের আগ্রহের কারণে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট নির্মাণ করেছিল আলমাস ও দিনার। এরকম একটা পরিবেশ ছিল এই নগরীতে। একটা সময় ছবি মুক্তি পেলে দর্শকরা এসব হলে ভিড় জমাতেন। চট্টগ্রামের সেই পরিবেশ কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

আমরা সবাই ঢাকাই যেতে চাই, চট্টগ্রামের শিল্প সংস্কৃতিতে এ ধারণাটা বদলাতে হবে। একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে সুবিধাগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে। প্রকাশনা শিল্প হয়ে গেছে বাণিজ্যিক। অথচ শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের কেন্দ্র হতে পারতো এই চট্টগ্রাম। বিনিয়োগ না থাকার কারণে বেড়ে উঠেনি এখানকার চলচ্চিত্র শিল্প। আবার ব্যাঙের ছাতার মতো অতিরিক্ত প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠেছে। যার মধ্যে মানহীন অলেখক তৈরি হচ্ছেন। যা গভীর সংকটে রূপ নিচ্ছে।

আমরা প্রশিক্ষকরা ভুল জেনারেশন তৈরি করছি। কারণ আমাদের মধ্যে বিনিময়টা খুব কম। আমার নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছি। অন্যের কাছ থেকে কোন পরামর্শ গ্রহণ করতে পারছি না। সেটা গান, আবৃত্তি বা নাটক যে কোন ক্ষেত্রে। দলগুলোর কার্যকর ভূমিকা না থাকায় নতুন নাট্যকার তৈরি হয়নি। দলগুলো সে ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমরা যদি একত্রিত হতে না পারি তাহলে শিল্পী তৈরি হবে না। আবার প্রচারে কৌশলটা পাল্টাতে হবে। আমরা যারা শিল্প সংস্কৃতির সাথে জড়িত আছি। তারা সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার যে কৌশল সেটা বদলাতে হবে। এক্ষেত্রে যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে হবে। অবকাঠামো অনেক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব অবকাঠামো শিল্প চর্চার উপযোগী কিনা সেটা একদম ভাবা হচ্ছে না। যদিও এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপরিকল্পনীয় এসব অবকাঠামো একসময় হয়তো কোন কাজে আসবে না।

 

সাহিত্যে ক্ষেত্রে একসময় আমাদের গর্বের জায়গা ছিল এই চট্টগ্রাম। যা উপমহাদেশের সাহিত্যে পথ দেখিয়েছে। ভাষা, সাহিত্য, লোকজ, থিয়েটারসহ হাজার বছরের যে ঐতিহ্য তা বৌদ্ধ স্তুতি থেকে এসেছে। এটারও সূচনা চট্টগ্রামে। আমরা অনেকে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের আঞ্চলিক সাহিত্যের যে গৌরব, তা যথাযথভাবে আমাদের লেখনিতে আনতে পারি নাই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশাল এক বৈচিত্র্যময় জীবন, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। চট্টগ্রাম টেলিভিশন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল। আদিবাসী মানুষের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো তারা তুলে ধরতে পারতো।

 

উপমহাদেশের মধ্যে অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়। এখানকার অবকাঠামো, পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা অসাধারণ। আমরা এই প্রতিষ্ঠানকে মাধ্যমে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারতাম। আমাদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো বিদগ্ধ প-িত মানুষও ছিলেন। আমাদের আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, অনুপম সেনের মতো অনেক মানুষ আছেন, যারা এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। গত ৫০ বছরে আমরা চট্টগ্রামকে ফোকাসে আনতে পারিনি। রাজনৈতিক ময়দানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোশেনের সাবেক মেয়র মরহুম এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজেকে আইডল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ঢাকা, সিলেট, গাজীপুর, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনগুলো তার কর্মকা- অথবা তার নেতৃত্ব অনুসরণ করতেন। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা এমন একজন আইডল তৈরি করতে পারিনি। শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গান একসময় চট্টগ্রামের পরিচয় বহন করতো। অথচ এতবছর পরে এসেও মুক্তিযুদ্ধের ভাল একটি নাটক চট্টগ্রামে রচিত হয় নাই।

 

একসময় ঢাকা আমাদের অনুসরণ করতো, এখন আমরা ঢাকাকে অনুসরণ করি। সবকিছুর ক্ষেত্রে আমরা ঢাকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। দৈনিক পূর্বকোণ প্রকাশিত হওয়ার পর ঢাকা প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকরা অপেক্ষায় থাকতো পত্রিকাটি পড়ার জন্য। কিন্তু সেটা ধরে রাখা যায়নি। এটা আমাদের অনেক বড় ব্যর্থতা। আমাদের কোন কাজে ধারাবাহিকতা নেই। বর্তমানে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও শিল্পকলা কেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া তেমন কোন আয়োজন হয় না। গ্রামে গঞ্জে চট্টগ্রামের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল তা এখন বিলুপ্তির পথে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট