চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

চট্টগ্রামের টেন্ডার গ্রহণ বেলজিয়ামে বসেই!

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১২:৩৪ অপরাহ্ণ

বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থান করে চট্টগ্রাম জেলার ১৬ খাদ্যগুদামের টেন্ডার গ্রহণ করলেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। এছাড়াও কানাডায় অবস্থান করা ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার অভিযোগ উঠেছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, খাদ্য কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে একটি সিন্ডিকেট সবকটি গুদামের টেন্ডার ভাগাভাগি করে নেয়। বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার ১৬ এলএসডি খাদ্যগুদামের শ্রম ও হস্তার্পণ (হ্যান্ডলিং) টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ১৪ জানুয়ারি ছিল টেন্ডার দাখিলের শেষদিন। এবার নতুন পদ্ধতিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়।

 

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় সূত্র জানায়, ১১৬ জন ঠিকাদার অংশ নেন। এর মধ্যে ৪৯ জনকে যোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়। বাকি ৬৭ জনের দরপত্র বাতিল করা হয়।

 

টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব ও সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) ফখরুল আলম বলেন, এসটিডি পদ্ধতি অনুসরণ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে।

 

৮ ফেব্রুয়ারি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন মনোনীত ঠিকাদারদের চুক্তি সম্পাদনের জন্য চিঠি দেন। চিঠিতে দেখা যায়, ৩১ জানুয়ারি টেন্ডার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়। হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য বলা হয়।

 

কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক জিওতে (সরকারি আদেশ) দেখা যায়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন ২৫ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশ সফরে ছিলেন। একই সময়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের ১২ জন কর্মকর্তা বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং জার্মানির বার্লিন সফরে ছিলেন। কারখানা পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণে দুটি দেশে সফরে যান তারা। তবে ওই সময়ে তারা অন-ডিউটিতে ছিলেন।

 

খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন বিদেশে অবস্থানকালে ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ১৬ খাদ্যগুদামের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করেন। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে তড়িঘড়ি করে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ টেন্ডারে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ ঠিকাদারের। বিদেশ সফরে থাকাকালীন টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করেছেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক।

 

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এক মিনিট পর কল দিচ্ছি বলে লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

 

তবে টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব ও সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) ফখরুল আলম বলেন, ওই সময়ে তিনি (খাদ্য নিয়ন্ত্রক) দেশে ছিলেন না। মনে হয় ডি-নথিতে কাজ করেছেন। আমি ডি-নথিতে যুক্ত না থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবো না।

 

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, হাটহাজারী, কাটিরহাট, বোয়ালখালী ও সাতকানিয়ার খাদ্যগুদামের ঠিকাদারি পেয়েছে মেসার্স জয় কনস্ট্রাকশন। সন্দ্বীপ ও রাঙ্গুনিয়া গুদামের কাজ পেয়েছে মেসার্স হাসান এন্ড কোং প্রতিষ্ঠান। সীতাকু-ে মেসার্স রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ। হাবিলদারবাসা ও নাজিরহাট গুদামে কাজ পেয়েছে আসাদ ট্রেডিং। রাউজানে মেসার্স তারিফ এন্টারপ্রাইজ, পটিয়ায় লোটাস এন্টারপ্রাইজ। দোহাজারীতে এস কে ট্রেডিং। লোহাগাড়া ও চানপুরঘাট গুদামে তানজিলা এন্টারপ্রাইজ। আনোয়ারা গুদামে জনি এন্টারপ্রাইজ।

 

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের চিঠি দিয়েছেন। একাধিক সূত্র জানায়, সীতাকু- খাদ্যগুদামের কাজ পেয়েছে মেসার্স রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ। রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। এই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. ইসমাইল গতকাল রাতে পূর্বকোণকে বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে আবদুর রাজ্জাক কানাডা সফরে রয়েছেন।

 

খাদ্য অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে চুক্তি হয় দ্বিপাক্ষিক। সরকার ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। তাই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক সশরীরে উপস্থিত থাকা অনেকটা বাধ্যতামূলক।

 

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব ফখরুল আলম বলেন, মনে হয় ওই সময়ে তিনি দেশে ছিলেন। বিষয়টি আমার ঠিক জানা নেই।

অসন্তোষ ৮২ ঠিকাদারেরহ্যান্ডলিং সংক্রান্ত দরপত্রের পূর্বের নিয়ম পরিবর্তন করে প্রথমবারের মতো এসটিডি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে খাদ্য বিভাগ। একটি বিশেষ সিন্ডিকেট গ্রুপকে কাজ দেয়ার জন্য খাদ্য বিভাগ এই ধরনের ‘বিরল টেন্ডার’ আহ্বান করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ৮২ ঠিকাদার। ১০০ নম্বর ভিত্তিতে ২০ নম্বরের ৫টি মানদণ্ডে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। দরপত্রের ৩ ও ৪ নাম্বার বিশেষ শর্ত পূরণ করা পুরনো সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য ঠিকাদারদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ৫-৬ জনের একটি সিন্ডিকেট পুরো খাদ্য বিভাগকে লুটেপুটে খাচ্ছে। প্রতিটি খাদ্য গুদাম ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারি কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে করেছেন ৮২ ঠিকাদার। খাদ্যমন্ত্রী, খাদ্য সচিব এবং খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ করেছেন তারা।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট