চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

চমেক হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১২:৫৫ অপরাহ্ণ

স্বাস্থ্য খাত দেশে এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যাগ্রস্ত। চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অন্যতম। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মানুষের মাঝে বিশ্বাস স্থাপন করাতে হবে। গণমাধ্যমই পারে সেটা করতে। মানুষের কাছে পজিটিভলি তথ্য তুলে ধরতে হবে। এতে বাংলাদেশ থেকে বছরে যে ১৫ বিলিয়ন ডলার বাইরের দেশে চলে যাচ্ছে তা রোধ করা যাবে। গতবছর ভারতে যত হেলথ ট্যুরিজম হয়েছে তার ৫৪ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে গেছে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য কোনো টাকা জমা রাখে না। তাই বিপদ আসলেই মানুষ অসহায় হয়ে যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থা ছাড়া বাকি চারটি মৌলিক অধিকার এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলো যদি ভালো হত তাহলে দেশের বাইরে থেকে আমাদের দেশেও চিকিৎসা নিতে আসত। আমাদের দেশে চার্জ অনেক বেশি। ওষুধের দামও বেড়ে গেছে। কয়েকদিন আগে কিছু ওষুধ কোম্পানির লোকদের সতর্ক করেছি। তারা হাসপাতালে গভীর রাত পর্যন্ত থেকে প্রেসক্রিপশন জেনারেট করে। নিজেদের কোম্পানির ওষুধ লিখে দেয়। তারা ওয়ার্ড কিনে ফেলছে। তারা চিকিৎসাসহ পুরো সমাজকে কলুষিত করছে।

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রধান সমস্যা হল স্থাপনা কিছু হয়নি। পুরনো ভবন নিয়েই চলছে সবকিছু। তারপরও ছোটবড় মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ শতাধিক অপারেশন করা হচ্ছে। এখন রংপুর মেডিকেলে ৭০টি, এম আব্দুর রব মেডিকেলে ৬০টি, বরিশালে ৭০টি আইসিইউ। অথচ চট্টগ্রাম মেডিকেলে ১১টি ছিল এখন কোনমতে ১৮টি চলে। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরা হলে চট্টগ্রামেরও বাড়ানো সম্ভব। আগামী সাত মাসের মধ্যে চমেকে শতাধিক আইসিইউ স্থাপন করা হবে। এনআইসির ঘাটতিও শিগগিরই পূরণ করা হবে।

 

চমেকে দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা জনশক্তি। ইজিপির কারণে চমেক এখন ভালো অবস্থানে। জাইকার যে ভবনটি হচ্ছে সেখানে দুটি এমআরআই, দুটি সিটি স্ক্যান, ছয়টি এক্সরে, ১০টি আলট্রাসনোগ্রাফি, মেমোগ্রাফ, ক্যাথল্যাবসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধাদি থাকবে। যেখানে আরও দুটি ল্যাব থাকবে। ক্যান্সার ভবনে লাইমেক থাকবে দুটি। কোবাল্ট ৬০ বেকিক থাকবে। চেষ্টা করলে ভারতের মতো কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট চমেকেও সম্ভব। কিডনি, হার্ট, ক্যান্সারের চিকিৎসা সহজলভ্য করা গেলে ভারত যাওয়ার প্রবণতা কমানো যাবে। চমেক আরও প্রায় দেড় হাজার সিট বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবন করার অনুমতি পেয়েছে।

 

প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর প্রতি অনুরোধ চিকিৎসা সেবা আরও ভালোমানের করে এবং খরচ কমিয়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার বাঁচিয়ে দেন। আপনারা সেবা ভালো দিয়ে কম টাকা নিলে বাংলাদেশের মানুষ আর দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাবে না। ডাক্তারদের বেতন ভাতা বাড়াতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষার পর আগে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন থাকত ডাক্তার হওয়ার কিন্তু বর্তমানে তারা সেটা আর দেখছে না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখন ঢাকাসহ দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। তারা এখন আর ডাক্তার হতে চায় না। তারা আর আসবেও না। কারণ এমবিবিএস পাস করার পর তারা হতাশ হয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা পায় বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেটা পায় না। এখন যেটা ১৫ মিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে যাচ্ছে সেটা ২০ মিলিয়ন হতে খুব একটা সময় লাগবে না। সেটা অবশ্যই চিন্তার কারণ। ডাক্তারদের বড় অংশ বিশ্রামে চলে যাচ্ছে। সে জায়গাগুলো খালি হয়ে যাচ্ছে। জায়গাগুলোতে দক্ষ জনবল আসা দরকার। ভালো সার্ভিস দেয়ার মতো হাসপাতাল চট্টগ্রামে আছে। যারা নৈতিক চর্চা করছে তাদের জন্য জনশক্তির অভাব হবে না।

 

চট্টগ্রাম থেকে একটা প্রস্তাব বেশ কয়েকবার দিয়েছি। সেটি হল ইউজার্ফ। এখানে প্রেস করলে সেটা যদি কিছু ডাক্তার পেত তারা সারারাত কাজ করত। এতে মানুষের অনেক লাভ হত। সান্ধ্যকালীন ডাক্তার যারা বসেন তাদের জন্যও নির্ধারিত বেতন ভাতা নির্ধারিত হয়নি। এখন স্বাস্থ্য এবং সেবা আলাদা হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের অনেক চিকিৎসকরা বিভিন্নভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রোগীরা সিনিয়র চিকিৎসকদের সেবা পাচ্ছেন না। খুব স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে চলছে সেবা। মেডিকেল চলছে ট্রেইনি এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার দিয়ে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার আছে ৮ শ’র কাছাকাছি। সিনিয়র চিকিৎসক আরও পেতে হলে কনসালটেন্ট পদ্ধতি চালু করতে হবে। যেটি সারা বিশ্বে  রয়েছে। তবে বেতনের পাশাপাশি সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা রাখতে হবে।

 

মেধাবীরা আসা বন্ধ করে দিয়েছে, দিচ্ছে। বর্তমানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ছেলেরা যে পরিমাণ কম আসা শুরু করেছে, মনে হচ্ছে কোটা দিয়ে তাদের আনতে হবে। ছেলেরা যা পারে অনেক মেয়ে চিকিৎসক তা পারে না। রোগীর সাথে সার্বক্ষণিক থাকেন নার্সরা। তারাই মূলত রোগীর সেবা নিশ্চিত করেন। ২২শ বেডের হাসপাতালে চমেকে নার্স রয়েছে তার অর্ধেক। আমলা কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না করে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট জনবল দিয়ে হাসপাতাল পরিচালিত হলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। স্বাস্থ্যখাতকে নির্দিষ্ট একজনের নেতৃত্বে নিয়ে আসা উচিত। প্রধানমন্ত্রী নার্সদের চাকরিকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করেছেন। তবে নার্সদের থেকে ভালো আউটপুট আসছে না। হার্ট, কিডনি এবং ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আট বিভাগে প্রধানমন্ত্রী আটটি ১৭ তলা ভবন করে দিচ্ছেন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ। চট্টগ্রাম মেডিকেলেও হবে। চট্টগ্রামের ভালো দিকগুলো বেশি বেশি তুলে ধরতে হবে। চমেক হাসপাতালে দুর্নীতি বর্তমানে নেই বললেই চলে। এখন যা আছে তা হল দালাল এবং মেডিসিন লেভেলের কিছু দুষ্কৃতিকারী।

 

হাসপাতাল নির্মাণের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে। দালালের ব্যাপারে আমরা যুদ্ধ করছি। আগের অনেক কিছু এখন নেই। এখন হয়তো জুনিয়র চিকিৎসকরা জড়িত। এসব এখন হয় ফুটপাতের ল্যাবগুলোতে। অথচ চমেক হাসপাতালে সব ধরনের টেস্টের সুযোগ-সুবিধা আছে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট