চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

সমন্বয় ও সততা না থাকলে কোন পরিকল্পনাই কাজে আসবে না

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ৪:৩৯ অপরাহ্ণ

আমাদের পাবলিককে একটা ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার না দিলে ট্রাফিক আইন মানানো যায় না। তাই ক্রসিং থেকে ১০০-১৫০ মিটার পর্যন্ত কোন লোকজন যেন ফুটপাত ছেড়ে আসতে না পারে সেজন্য রাস্তার পাশে স্টিল রেলিং দিয়ে দেয়া যায়। এতে করে লোকজন যেহেতু আসতে পারবে না, কোন ধরনের ট্যাক্সি বা রিকশাও রাস্তার পাশে দাঁড়াবে না। তাকে ১০০-১৫০ মিটার পরে দাঁড়াতে হবে।

এটা যদি আমরা এনশিওর করতে পারি সিটি কর্পোরেশন বা সিডিএর পক্ষ থেকে, তাহলে কেউ রাস্তা পার হতে হলেও তাকে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে হবে। এতে রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমে যাবে। রাস্তাগুলোতে বাসস্টপের জন্য কোন জায়গা নেই। ১২০ ফিটের একটা রাস্তায় দুই দিকে ২০ ফুট করে ৪০ ফুট চলে যায় গাড়ি দাঁড়ানোর জন্য। কিছুক্ষণ পরপর বাস বা ট্যাক্সি দাঁড়াচ্ছে। এজন্য আমরা রাস্তা যতই প্রশস্ত করি কোন কাজে আসছে না। আমরা রোড ডেভেলপ করছি, মেনটেইন করছি। কিন্তু কোন বেনিফিট পাচ্ছি না।

 

আমরা পুরো রাস্তার জন্য যদি জায়গা নিতে পারি, তাহলে বাসস্টপের জন্য দশ-বিশ ফিট জায়গা নিতে পারবো না? এটা এক্সেপ্টেবল না। এখানে হয়তো প্ল্যানিংয়ের অভাব ছিল। মোড় থেকে ১০০-১৫০ ফুট দূরে গিয়ে বাসস্টপ করলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। এছাড়া বাসস্টপের জন্য আলাদা একটা ব্যবস্থা করলে রাস্তার ইউটিলিটি কিন্তু অনেক বেড়ে যায়। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নিয়ে যদি আমরা বলি, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে অরিজিনাল ডিজাইনে আরকান রোড থেকে ডানদিকে মুরাদপুরের দিকে আসার জন্য একটা মাল্টিলেভেলের ফ্লাইওভার ছিল। কিন্তু ইমপ্লিমেন্টেশনে আসার পরে এটা বাদ দিয়ে দেয়া হলো। আর দুনিয়াতে কোথাও আমি দেখিনি বামদিকে যাওয়ার জন্য ফ্লাইওভারে একটা লেন করে দেয়। এটা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্য। বামদিকে যাওয়ার জন্য ফ্লাইওভার পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। লেফট টার্নের জন্য কোন ফ্লাইওভার দরকার নেই। অথচ আমরা এই ফ্লাইওভারটা দিয়েছি লেফট টার্নের জন্য। এখানে লেফটে যাওয়ার জন্য ফ্লাইওভার না করে নিচ দিয়ে একটা লিংক রোড করে দিলেই হতো।

আরেকটা হচ্ছে দুনিয়াতে কোথাও ফ্লাইওভারের মাঝখানে ফাঁকা থাকে না। কিন্তু এখানে ফ্লাইওভারের মাঝখানে কেটে দিলেন। এতে করে এ ওর সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। এটা একটা দোতলা রাস্তা। ইটস নট এ ফ্লাইওভার।

ওয়াটারলগিং নিয়ে আমাদের অনেকগুলো প্রজেক্ট হয়েছে। তবে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবো এটা সমাধান হয়নি। ২০ বছর কিংবা ৩০ বছর আগে দেখেন, কোন ওয়াটারলগিং ছিল না। তাহলে ওয়াটারলগিং কেন শুরু হলো আমরা কিন্তু চিন্তা করিনি একবারও। এখন কিন্তু আসমান থেকে পাম্প দিয়ে পানি ঢালছে না কেউ। বৃষ্টি এখন যেমন হয় আগেও তেমনই হতো। কিন্তু সব জায়গায় কতগুলো বিল ছিল। পানিগুলো বিলের দিকে নেমে যেতো। ফলে আর ওয়াটারলগিং হতো না।

এখন আমরা সবাই চিন্তা করছি একটা প্লেট, সেই প্লেটে পানি জমছে, প্লেটটাকে ভরাট করে আমরা উপরে তুলছি, ছিদ্র কিন্তু বড় করছি না কেউ। প্লেট যত উপরে উঠছে পানিও উপরে উঠছে। আপনি রাস্তাঘাট যত উঁচুই করেন না কেন, পানি তো এর ওপর দিয়েই যাবে। ওয়াটারলগিং প্রজেক্টের সময় আমরা বারবার বলেছি ওয়াটার ডিটেনশন পন্ড যদি না হয়, তাহলে এই প্রজেক্ট সাকসেসফুল হবে না।

দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের যে পাহাড়গুলো আছে, এগুলোর সমস্ত পানি সমতলে চলে আসছে। আবার পাহাড় কাটার কারণে সমস্ত বালিও এদিকে চলে আসছে। আমরা পাহাড় কাটা বন্ধ করতে পারছি না। এজন্য পাহাড় ব্যবস্থাপনা করা দরকার। পাহাড়গুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়গুলো যেন ধসে না যায়। এগুলো এখনও ইমপ্লিমেন্ট করা সম্ভব হয়নি।

সিটি কর্পোরেশন বা বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হয় পাহাড়ধসের পর লোকজন মারা গেলে করণীয় কী হবে তা নিয়ে। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে তাদেরকে কীভাবে প্রটেক্ট করা যায় তা নিয়ে কারও খুব একটা আগ্রহ নেই। এর কারণ হচ্ছে পাহাড় যদি না ধসে তাহলে শুধু সাধারণ মানুষ বেনিফিটেড হবে। আর পাহাড় যদি ধসে তাহলে আমিসহ সিস্টেমে যারা আছে, যত ডিপার্টমেন্ট, যত মন্ত্রী, এককথায় সাধারণ মানুষ ছাড়া সবাই লাভবান হবে।

পাহাড় ধসে গেলে তারা ডেভেলপারকে দিয়ে জায়গা-জমি করে প্লট বিক্রি করতে পারবে, সেটা তারা দখল করতে পারবে। কিন্তু পাহাড় থাকলে তো কিছুই করতে পারছে না। এ বিষয়টা যে আমরা জানি না, তা কিন্তু না। আমরা নিজেরাই সম্ভবত চাই পাহাড়গুলো ভেঙে যাক। এজন্য পাহাড়ধস নিয়ে কাউকে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। আমরা সবাই শুধু মুখেই বলছি পাহাড়ধস বন্ধের কথা কিন্তু আমরা কেউ আন্তরিকভাবে চাই না পাহাড়গুলো রক্ষা হোক। কাজেই আমাদের মূল জায়গাটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

আমাদের ওয়াটারলগিং প্রজেক্টের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়হীনতা। সিটি কর্পোরেশনে একধরনের লোক আছে, সিডিএতে আরেক ধরনের লোক আছে, ওয়াসাতে আরেক ধরনের লোক আছে, রেলওয়েতে অন্যধরনের লোকজন আছে। এরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা সেক্টর হ্যান্ডেল করে। কিন্তু আমাদের বুয়েট, চুয়েট এ ইনস্টিটিউটগুলোতে সব ডিপার্টমেন্টের এক্সপার্ট আছে। সব ডিসিপ্লিনের এক্সপার্ট আছে। তাদের কাছে পরিকল্পনা পাঠালে তারা হয়তো সমন্বয় করে বলতে পারতো এটা করা ঠিক না বা এটা এভাবে করা যেতো। কিন্তু সেটা আমরা করিনি। আমরা সব কাজ নিজেরা করতে চেয়েছি।

আর কোন ডিপার্টমেন্ট থেকে কোন একটা প্ল্যান করলে বাকিরা সেটা ওন করা উচিত। সিটি কর্পোরেশন যদি কোন একটা প্ল্যান করে, বাকি ডিপার্টমেন্টগুলোরও সেটা নিয়ে কনসার্ন থাকতে হবে। তাহলে সমন্বয়হীনতা আর থাকবে না। এজন্য সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, সিডিএ, ট্রাফিক, এনভায়রনমেন্ট, রেলওয়েসহ আমাদের প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টকে নিজেদের মাস্টারপ্ল্যানের পাশাপাশি অন্য ডিপার্টমেন্টের মাস্টারপ্ল্যানকেও ওন করতে হবে। আমরা অন্যের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেই। বাংলাদেশে সবধরনের রিসোর্স আছে। কোন কিছুর অভাব নেই। অভাব শুধু সততার। সততা থাকলে আমার প্ল্যান ভুল হলেও সেটা রিভিউ করা যেতো। কিন্তু আমরা জেনেশুনে কিছু অনিয়ম করছি। কিছু অনিয়ম আমরা নিজেরা করছি, আবার কিছু অনিয়ম অন্যরা আমাদের দিয়ে করাচ্ছে। এজন্য আমাদের মাস্টারপ্ল্যান কিংবা প্রজেক্টগুলোর যথাযথ কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, বিআরটিএ, পিডিবিসহ আমাদের প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব একটা প্ল্যান থাকে। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে একটা ডিপার্টমেন্টের সাথে আরেকটা ডিপার্টমেন্টের প্ল্যানের সমন্বয় থাকে না। কখনও কখনও একটা ডিপার্টমেন্ট আরেকটা ডিপার্টমেন্টের মুখোমুখি হয়ে যায়। ওয়াসা একটা পানির পাইপ বসাতে গেলে সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা কাটতে হয় কিংবা সিডিএ কোন অবকাঠামো করতে গেলে পিডিবির লাইন কাটতে হয়।

এক্ষেত্রে যদি প্রত্যেক ডিপার্টমেন্ট তার প্ল্যানের মাঝে অন্য ডিপার্টমেন্টের ক্ষতিপূরণও যোগ করে দেয়, তাহলে এ সমস্যাটা হয় না। ওয়াসা যদি রাস্তা কাটে তার মেরামতের খরচ সিটি কর্পোরেশনকে দিয়ে দিলো। তারা তা দিয়ে রাস্তা মেরামত করে নিলো। কিংবা সিটি কর্পোরেশন ওয়াসার পাইপ কাটলে তার মেরামতের খরচ দিয়ে দিলো। এতে কেউ কারও প্রজেক্টে বাগড়া দেবে না।

স্লুইস গেটের কথা বলা হচ্ছে। মাটি বা রাস্তা উঁচু করাটা সলিউশন নয়। আমরা সব জায়গায় রাস্তা উঁচু করছি, ভিটে উঁচু করছি। ইট ইজ নট এ সলিউশন। নেদারল্যান্ডস তো পুরো দেশটাই সি লেভেলের নিচে। তারা কী করছে? তারা বাঁধ দিয়ে পাম্প করে ঠিকই চলছে। পানি ওঠার কোন প্রশ্নই উঠে না। আমাদের ঢাকায়ও বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি পাম্প করে বের করে দেয়া হচ্ছে। আমরা এগুলো ট্রাই করতে পারি।স্লুইস গেট দেয়া হয় যাতে নদী থেকে পানি না আসে। জোয়ারের পানি যেন না আসে। কিন্তু যেখানে স্লুইসগেট নেই, সেখানে কী হবে? দুই মাইল জায়গার দু’শো ফিটও যদি খালি থাকে সেখান দিয়েও জোয়ারের পানি ঢুকে যাবে। কাজেই আমি যদি পুরোটা কমপ্লিট করতে না পারি তাহলে বাইরের পানি বন্ধ করতে পারবো না।

আর ভেতরের পানি সরানোর জন্য পাম্প করা ছাড়া কোন অপশন নেই।

আরেকটা বিষয় হলো আমাদের প্রকল্পগুলো শতভাগ ডিজাইন হওয়ার আগেই কাজ শুরু হয়ে যায়। এতে করে কনস্ট্রাকশন আর রিকনস্ট্রাকশন করতে হয় বারবার। উপর মহলের চাপের কারণে এমন তাড়াহুড়ো করতে হয়। কিন্তু আমাদের ডিপার্টমেন্টগুলো যদি নিজেরা সৎ হয় তাহলে কোন চাপই এক্ষেত্রে কাজে আসবে না। ভুলভ্রান্তি থাকবেই। সেসব ভুলভ্রান্তি হয়তো আমরা ওভারকাম করতে পারি। কিন্তু সততার অভাব থাকলে কোন মাস্টারপ্ল্যান কিংবা কোন প্রজেক্টেই সমস্যার সমাধান আসবে না।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট