চট্টগ্রাম সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪

সর্বশেষ:

খাদ্যে গভীর সখ্যতা আ. লীগ-বিএনপি সিন্ডিকেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক

৮ নভেম্বর, ২০২৩ | ১২:২৫ অপরাহ্ণ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-দুই দলের অবস্থান দুই মেরুতে। বর্তমানে দুই দলের বৈরিতায় অস্থির হয়ে উঠেছে রাজনীতি। এই অবস্থায় খাদ্য বিভাগের টেন্ডার ভাগাভাগিতে দুই দলের ঠিকাদারদের মধ্যে গড়ে উঠেছে গভীর সখ্য। খাদ্য বিভাগ ও ঠিকাদার সূত্র জানায়, গত দুই দশক ধরে হালিশহর ও দেওয়ানহাট খাদ্য গুদামের শ্রম হ্যান্ডলিং ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঘরনার একটি সিন্ডিকেট। তবে ওই সিন্ডিকেটে বিএনপি ঘরনার এক ঠিকাদারও রয়েছে।

 

দীর্ঘদিন পর দুই খাদ্য গুদামের শ্রম হ্যান্ডলিং ঠিকাদারের টেন্ডার আহ্বান করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। ৫ নভেম্বর ছিল টেন্ডার জমাদানের শেষদিন। তবে এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন পূর্বকোণকে বলেন, ‘টেন্ডার জমাদানের পর প্রসেসিংয়ে রয়েছে। তাই এ বিষয়ে জনসম্মুখে কিছু বলা যাবে না।’ কতটি ফরম জমা পড়েছে তাও জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন তিনি।

 

এবার টেন্ডার ফরমে একশ নম্বারের কঠিন পরীক্ষার ভিত্তিতে ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। হাতেগোনা ঠিকাদার ছাড়া সাধারণ ঠিকাদারদের অংশ নেওয়া অসম্ভব। সেই সুযোগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘরনার তিন ঠিকাদার সিন্ডিকেট একাট্টা হয়েছে। এর নেপথ্যে ছিল সিক্স স্টার খ্যাত পুরোনো সিন্ডিকেট। এতে সিন্ডিকেটের আকার বেড়ে আট বা নয় জনে দাঁড়াবে। এরমধ্যে পুরানো ও নতুন মিলে বিএনপি ঘরনার তিন ঠিকাদার যুক্ত হচ্ছে।

 

বর্তমানে হালিশহর সিএসডি গুদামে ঠিকাদারির দায়িত্বে রয়েছে মেসার্স রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজ, দেওয়ানহাট গুদামে মেসার্স জয় কনস্ট্রাকশন। রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের মালিক আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাক। আর জয় কনস্ট্রাকশনের মালিক যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক।

 

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘরনার ঠিকাদারদের ঐকমত্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার লক্ষ্য হচ্ছে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া। শত্রু নিয়ে নয়, বন্ধু বাড়িয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে।’ টেন্ডারে জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেক কিছু মেইনটেইন করতে হয় বলে জানান তিনি।

 

জয় কনস্ট্রাকশনের সৈয়দ মাহমুদুল হকের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি।

 

কেন সখ্যতা:

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বর মাসে হালিশহর খাদ্য গুদামে শ্রম হ্যান্ডলিংয়ে ৫৮ লাখ ৫৬ হাজার ১৫৪ টাকা বিল জমা দিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ হিসাবে খরচ দেখানো হয় ৪০ লাখ ৭২ হাজার ৩৫৪ টাকা। আবার গুদামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ১৮ শতাংশ কেটে মোট লাভ দেখানো হয় ১২ লাখ ২২ হাজার ৬১৩ টাকা। তা আবার আট ভাগে ভাগ করা হয়। জনপ্রতি এক লাখ ৫২ হাজার ৮২৬ টাকা করে ভাগে পায়। একই মাসে দেওয়ানহাট গুদাম থেকে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভাগে পায় এক লাখ ৫ হাজার ৪৫৬ টাকা। অর্থাৎ দুই গুদামে জনপ্রতি দুই লাখ ৫৮ হাজার ২৮২ টাকা করে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। গত দুই বছরের খাদ্য বিভাগে জমা দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ মাসে বিলের কপি এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া যায়। ৬ জনের সিন্ডিকেট বলা হলেও লাভের ভাগ-বাটোয়ারা হয় আট ভাগ।

 

একাধিক ঠিকাদার জানান, খাদ্যশস্য লোডে ট্রাকপ্রতি (১৫ টন) বকশিসের নামে ৫শ টাকা ও আনলোডে ৯০০ টাকা করে আদায় করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে অলিখিতভাবে এ প্রথা চলে আসছে। বকশিসের টাকা দিয়ে শ্রমিকদের খরচ মেটানো হয়। আর সরকার থেকে নেওয়া লাখ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এসব কারণে ঠিকাদারদের লোলুপ দৃষ্টি থাকে হ্যান্ডলিং ঠিকাদারে। তাই সরকারকে ঠকাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘরনার বড় ঠিকাদাররা একাট্টা হয়েছেন।

 

খাগড়াছড়িতেও একই সিন্ডিকেট :

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছর পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির ১১টি এলএসডি গুদামের শ্রম ও হস্তার্পণ ঠিকাদার নিয়োগে ১২৮৬টি ফরম বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি গুদামে বিপরীতে ১১৭টি ফরম বিক্রি করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সবকটি গুদামে পুরোনো ঠিকাদাররাই বহাল রয়েছে। কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ঠিকাদার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর কলকাঠি নেড়েছেন চট্টগ্রামের দুইজন ও খাগড়াছড়ির এক বড় ঠিকাদার। চট্টগ্রামের দুই সিএসডি গুদামেও ওই সিন্ডিকেট টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে।

 

পূর্বকোণ/আরডি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট