চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪

সমৃদ্ধির পথে আরও এক ধাপ

নাসরীন মুস্তাফা

২৮ অক্টোবর, ২০২৩ | ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

ব্যাচভিত্তিক বন্ধুদের এক গ্রুপে ইউরোপ-আমেরিকা-যুক্তরাজ্য আর মধ্যপ্রাচ্যে থাকা কয়েক বন্ধুর আগে কাজ ছিল বিদেশের নানা সুন্দর জায়গায় ছবি তুুলে ফেসবুকে শেয়ার করেই ইনবক্সে হানা দেওয়া।

লাইক কৈ? লাইক দিলাম তো বলবে, কমেন্ট দিলি না? কমেন্ট অবশ্যই হতে হবে এরকম, কী সুন্দর ছবি! ওয়াও! অসাম!

কমেন্টের রিপ্লাই যা দিত বন্ধু, তাতে চোখে আঙুল দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে ছাড়ত যে, বন্ধু আমার বিশেষভাবে ভাগ্যবান বলেই এত সুন্দর বিদেশি জায়গায় থাকে, ছবি তোলে। ভাগ্য ফেরাতে ওদের মতো দেশ ছেড়ে যাওয়ার তাগাদা থাকে, কখনও কখনও থাকে ঠাট্টাও। বাংলাদেশের নাকি এটা নেই, সেটা নেই। এটা হবে না, সেটা হবে না। নানারকমের নেতিবাচক শব্দ ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ আর আরবি ভাষার সাথে মিশিয়ে অন্তর্জাল ভেদ করে মিসাইলের মতো আমার এবং আমার মতো ভাগ্যহীনদের বুকে আঘাত হানতে ওদের আনন্দ আমরা অনুভব করতে পারতাম। ওদের দিকে তীর ছুঁড়তে আমাদের পদ্মা সেতু হচ্ছে জানিয়ে যা কিছু বলতাম, শুনতাম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানানোর অবাস্তব জেদ করছেন।

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার দিবাস্বপ্ন আমরা কীভাবে কীভাবে যেন দেখেই ফেললাম। পদ্মা সেতু বানিয়েই ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী। মাত্র আট মিনিটে সেতু পার হয়ে ভিডিও পাঠালে ওদের ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ আর আরবি ভাষার নানা নেতিবাচক শব্দ মহামান্য আদালতের রায়ের মতো শুনিয়ে দিল, তৃপ্তির ঢেকুর তোলার অধিকার আমাদের নেই। এরপর যখন মেট্রোরেলে উঠে ছবি পাঠালাম, নেতিবাচক শব্দের ঝংকার একটু কম মনে হলো। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন হলে ওরা স্পষ্টতঃ দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে টের পেলাম। বাংলাদেশ পরমাণু ক্লাবে নাম লেখাতে পেরেছে, এটা ভাল কিংবা মন্দ কিংবা যা হোক একটা কিছু নিয়ে শব্দরা ফুটলেও তাতে ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ আর আরবি ভাষার আধিক্য কমে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সুখ খুঁজে পাওয়া বন্ধুটি এই প্রথম একশ’ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে দারুণ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে খবর দিল, ওর এলাকায় নদীর নিচে সেইরকম এক টানেল হয়েছে, মাত্র চার মিনিটে নদী পার হয়ে যাবে গাড়ি। আর দেখতে সে টানেল এমন সুন্দর, মনে হয় সুইজারল্যান্ড নাহয় নেদারল্যান্ডে হয়েছে।

খটকা লাগে। সুইজারল্যান্ড নাহয় নেদারল্যান্ডে হলে ওর এলাকা হয় কীভাবে? ও তো থাকে দুবাইয়ে।

ধুর! দুবাইও পারেনি এরকম টানেল বানাতে। তুরস্ক আর কাতারে আছে শুনেছি। ভেবে দ্যাখ, আমার কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল, সেই টানেল দিয়ে হাজারে হাজারে গাড়ি মাত্র চার মিনিটে নদী পার হয়ে যাবে! জানিস! দক্ষিণ এশিয়ায় হওয়া নদীর নিচ দিয়ে প্রথম টানেল এই আমার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। আমার কর্ণফুলী টানেল।

বন্ধুর বাড়ি কর্ণফুলী নদীর পাড়ের শহর চট্টগ্রামে। ও আমাদের বুঝিয়ে বলে নদীটি শহরটাকে দুইভাগে ভাগ করেছে কীভাবে। একভাগে আছে দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম আর দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। আরেকভাগে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্প এলাকা। নদীর উপর তিনটি সেতু বানাতে হয়েছিল প্রয়োজন মেটাতেই। কিন্তু যানবাহনের চাপে যে গতি দরকার, সে গতিতে চলা সম্ভব হয় না। স্থবির হয়ে থাকে সব। এই স্থবিরতা অসহ্য ছিল বলেই তো গতি খুঁজতে বিদেশের জীবন বেছে নিয়েছিল। এই স্থবিরতা কাটছে বলেই তো বুকের মাঝে কর্ণফুলী নদীর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ টের পেয়ে বলতে পারছে, আমার এলাকা, আমার নদী, আমার টানেল!

দুয়েকজন বলে অবশ্য, আরও সেতু বানানোর কথা ভাবা যেত। জবাব বন্ধুটিই দেয়। নদীর তলদেশে পলি জমার সমস্যা আর চট্টগ্রাম বন্দরকে ঝামেলায় না ফেলার কথা ভাবতে গিয়ে সেতুর বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবতেই হয়। তবে তা ভাবার মতো সাহস বাংলাদেশের হয়েছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাপের মতোই সাহস দেখিয়ে ভাবলেন যা, তা এই দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও কোন দেশ ভাবেনি। চট্টগ্রাম জেলার দুই অংশকে সংযুক্ত করতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চার লেনের সড়ক টানেল তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলাকেও টানেলটি চট্টগ্রামের মূল শহরের সাথে সংযুক্ত করবে। টানেলের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে ৫.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ২টি সংযোগ সড়ক আর ৭২৭ মিটার দীর্ঘ একটি ওভারব্রিজ থাকছে যানবাহনের গতি চলমান রাখতে।

 

কেউ কেউ ভাবতে বসে, এতে চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অন্য অংশের লাভ কী? পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চল তথা সারাদেশে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে, কর্ণফুলী টানেল কি কেবল চট্টগ্রামের লাভ আনবে?

 

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাথে যুক্ত হয়ে এই টানেল সারাদেশেই গতি এনে দিচ্ছে, এটা বুঝতে কি রকেটবিজ্ঞানী হওয়া লাগে বন্ধুগণ? লাগে না। তবে নদীর পানির ৯-১১ মিটার নিচে মূল টানেলে ৩৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ২টি টিউব বানাতে সত্যিকারের কারিগরি দক্ষতার দরকার হয়েছে, সে কথা স্বীকার করতেই হয়। ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর চীনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংকে সাথে নিয়ে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন এন্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু করে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। মোট নির্মাণ ব্যয় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ সহায়তা দিচ্ছে চীন।

 

আমরা গুগল ম্যাপ নিয়ে অতঃপর ব্যস্ত হই। বন্ধুটি যারা চট্টগ্রামের নই, তাদেরকে নিজের বাড়ি চেনানোর মতো করে বলে, এই যে চট্টগ্রাম শহরের এক প্রান্তে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি। এর পাশ দিয়ে শুরু হয়ে এই সুড়ঙ্গপথ নদীর দক্ষিণ পাড়ের আনোয়ারা প্রান্তের চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার লিমিটেড কারখানার মাঝখান দিয়ে নদীর দক্ষিণ প্রান্তে আসবে।

চট্টগ্রাম শহরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। কী রকম আধুনিক হয়ে উঠবে শহরটা! আমি জানালাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম শহরকে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা ‘এক নগর দুই শহর’ এর মডেলে গড়ে তুলতে চান।

ইতোমধ্যে গুগলের কল্যাণে বিস্তারিত জেনে ফেলা ইউরোপবাসী বন্ধু বলল, ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ের সাথেও যুক্ত হবে এই টানেল। চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্ব বেড়ে যাবে আরও। চট্টগ্রাম বন্দরের সুযোগ সুবিধা বাড়বে, কেননা মাল পরিবহন সহজ হবে।

আমেরিকাবাসী মনে করিয়ে দিল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিমানবন্দরেরও কিন্তু ব্যস্ততা বাড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দেশের জিডিপিতে বার্ষিক শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে বলে জানিয়ে যুক্তরাজ্যবাসী বলল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ তো এই টানেল নির্মাণের পরবর্তী সিক্যুয়েল হে!

দুবাইবাসী বলে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার সড়ক ও রেল যোগাযোগ আরও উন্নত হবে। মীরসরাই থেকে মেরিনড্রাইভের পাশে অনেক শিল্প এলাকা গড়ে উঠবে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত-কক্সবাজারে পর্যটন কীভাবে বেড়ে যাবে! কম সময়ে কম খরচে মন চাইলেই সাগরের কাছে ছুটে যেতে পারবি তোরা….

মানে আমরা, যারা দেশে থাকছি। আমরা ভাগ্যবান, এমনটাই মনে হয় ওর, আমাদের তো বটেই।

বাংলাদেশের প্রথম সুড়ঙ্গ পথ আর দক্ষিণ এশিয়ায় নদী তলদেশের প্রথম ও দীর্ঘতম সড়ক সুড়ঙ্গপথ পাওয়ার আনন্দে বন্ধুটি আমার হাসলেও চোখ ছিল ভেজা। ধরা গলায় বলল, খুব শিঘ্রই ফিরছি। ব্যাচের বন্ধুদের রিইউনিয়ন সাগরের পাশে হবে, এই ঘোষণা দিয়ে বাকি প্রবাসী বন্ধুরাও সোল্লাসে জানিয়েছে, আসছে তারা।

২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল ওরফে কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ তো আসলে কেবল উদ্বোধন নয়, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। সক্ষমতার শক্তি প্রতিটি বাংলাদেশির মেরুদ-ে সাহস আনছে, তা দেশেই হোক আর বিদেশে। এই মেরুদ-ের নাম কী দেওয়া যায়? স্মার্ট মেরুদ-? – পিআইডি ফিচার

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট