চট্টগ্রাম বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

বন্যা প্রতিরোধে ‘সুখবর’ নেই

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২৬ আগস্ট, ২০২৩ | ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

পাঁচ কারণে সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমায় প্রবাহিত হওয়ায় এ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামীতেও এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করলেও এই অঞ্চলে বন্যা প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধানের আপাতত সুখবর দিতে পাচ্ছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড।

 

পাউবোর কর্মকর্তা ও জাইকার অভিমত, সাঙ্গু নদীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলে বন্যা প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধান মিলবে। কিন্তু বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার মতো পরিপাশ্বিক অবস্থা সাঙ্গু নদীতে নেই। সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের সাঙ্গু নদীর দুই পাড়ে ৪৫ কিলোমিটার করে ৯০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণ করে বাঁধ নির্মাণে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। যা অত্যধিক ব্যয়বহুল ও দুর্ভেদ্য। সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বিকল্প হিসেবে সাঙ্গু নদী ড্রেজিং ও লুফকাট করার পরামর্শ দিয়েছে জাইকা।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী সাতকানিয়া ও চন্দনাইশসহ আশপাশ অঞ্চলে বন্যার জন্য প্রধানত পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন তিনি। কারণগুলো হল : ১. মিয়ানমার থেকে বান্দরবানের রেমাক্রি হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সাঙ্গু নদী। পাহাড়ের ফোঁকর গলে সর্পিল আকারের সাঙ্গু ১৮৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাগরে মিলেছে। প্রবেশস্থল বান্দরবান পাহাড়ি অঞ্চলে বনাঞ্চল উজাড় করার কারণে পাহাড়ি মাটি ধসে নদীতে পলি জমে যায়। ২. নদীর চ্যানেল (ভূ-প্রাকৃতিক) গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনে একদিকে ভাঙছে, অন্যদিকে চর জেগে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৩. অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে তীব্র নদী ভাঙন। ৪. সাঙ্গু তীরবর্তী সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় বেড়িবাঁধ না থাকায় পানি দুকূল উপচে দ্রুত জনপদে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ৫.৩০ বছরের মধ্যে
সর্বোচ্চ বৃষ্টির কারণে পানি বিপৎসীমায় প্রবাহিত হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ পূর্বকোণকে বলেন, সাঙ্গু নদীতে চার দশমিক ১৫ মিটার অর্থাৎ সাড়ে ১৩ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হয়েছে। যা বিপৎসীমার উপরে। এই অঞ্চলে ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এত উচ্চতার পানি প্রবাহিত হওয়ার মতো সক্ষমতা সাঙ্গু ও ডলু খালের নেই। তাই পানির স্রোত দুই কূল চাপিয়ে বন্যা সৃষ্টি হয়। বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়।

 

৩ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বান্দরবানে ৬৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৬০০ মিলিমিটার। বৃষ্টির পানি প্রবাহের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সাঙ্গু নদী। কিন্তু সর্পিল আকারের সাঙ্গু নদীর পরতে পরতে বাঁক, ভাঙা-গড়ায় জেগে উঠা চরগুলো পানি প্রবাহে রুষ্ট রূপ ধারণ করে। পানিনিষ্কাশনের পথ আটকে যাওয়া, নদীর উপর সেতু নির্মাণ, নদী তীরবর্তী এলাকায় বাড়িঘর ও নানা অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বৃষ্টির পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি হারিয়ে ফেলে।

 

সাঙ্গু নদীর পানি উৎস, ধারণ ক্ষমতা ও গতি-প্রকৃতি নিয়ে সমীক্ষা করছে জাইক (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি)। ২০২১ সাল থেকে এ সমীক্ষা করে আসছে জাইকা। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে সাঙ্গু নদীর ভাঙনরোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছে জাইকা। তবে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ব্যয়বহুল। অস্থায়ী সমাধানের জন্য পাহাড়ের মাটি ক্ষয়রোধে বনায়ন ও নদীর লুফকাট (চর কেটে দেওয়া) করে নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ এ বিষয়ে পূর্বকোণকে বলেন, ‘সাঙ্গুর সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে ৯০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। টেকসই বাঁধ নির্মাণের শর্ত হচ্ছে, নদীর ৫০-১০০ মিটার দূরত্বে বাঁধ নির্মাণ করা। এসব অংশে শত শত ঘরবাড়ি রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন করে বাঁধ নির্মাণে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। তাই অর্থনৈতিক সঙ্গতি নিয়ে সংশয়-সন্দেহ রয়েছে।

 

সাম্প্রতিককালের বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসনের হিসাব, সাতকানিয়ায় দুই হাজার ৪৭৯টি ঘর আংশিক ও নয় হাজার ১৮৫টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। চন্দনাইশে চার হাজার ১২০টি ঘর আংশিক ও ৬ হাজার ৩৭৯টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোহাগাড়ায় ২৫শ ঘর আংশিক ও দুই হাজার ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।

 

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী পূর্বকোণকে বলেন, ‘পাহাড়ি ঢল আর ভারী বর্ষণে ডলু নদীর তীর রক্ষাবাঁধের সাতকানিয়া অংশের ভাঙনরোধ ও সংস্কারের জন্য পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম থেকে অনুমোদন নিয়েছি। এছাড়া বন্যায় যেসব ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সংস্কার কাজও দ্রুত শুরু হবে।’

 

কাপ্তাই বাঁধের আদলে প্রকল্প গ্রহণের কথা বলেন চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পানি আটকে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবে ওই প্রকল্পে।’

 

সাতকানিয়ার বাসিন্দা জাফর আলী বলেন, ‘১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বাড়ির উঠানে পানি উঠেছিল। কিন্তু এ বন্যায় পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর এ ধরনের বন্যা এই অঞ্চলে আর হয়নি।

 

অবৈধ বালু উত্তোলন : পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সাঙ্গু নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাতকানিয়ার নলুয়া, আমিলাইশ, বৈলতলী ও আনোয়ারা জুঁইদণ্ডী এলাকায় ব্যাপক হারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, বালুমহাল ইজারা দেয় প্রশাসন। কিন্তু ইজারাদার ইচ্ছেমতো স্থান থেকে বালু উত্তোলন করে। বিশেষ করে নদীর যে অংশে সড়ক যোগাযোগের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে, সেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। ভাঙা-গড়ার খেলায় এক দিকে ভাঙলে অন্যদিকে চর জেগে উঠছে। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পানি লোকালয়ে ছাপিয়ে যায়। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান এক কর্মকর্তা।

 

পূর্বকোণ/আরডি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট