চট্টগ্রাম বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৫ মে, ২০১৯ | ২:৫০ এএম

মতিঝর্ণা পাহাড়ে অভিযান

উচ্ছেদে বাধা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতার

গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ট্রান্সফর্মার খুলতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত
নিজস্ব প্রতিবেদক হ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-রাজনীতির মাঠে দুই মেরুর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল। নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে বৈরী সম্পর্ক। তবে লালখান বাজার এলাকার মতিঝর্ণা পাহাড়ের অবৈধ বসতি উচেছদের বিরুদ্ধে দুই দল এক। গতকাল শনিবার সকালে মতিঝর্ণা পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ ও পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। চার ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। নগর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
একাধিক সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং একটি ট্রান্সফর্মার খুলে নেয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম, মতিঝর্ণা ইউনিট আওয়ামী লীগ নেতা এস এম ইব্রাহিম ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় কয়েকশ নারী-পুরুষ জড়ো হয়ে হইহুল্লোড় শুরু করেন।
মহিলা দলের সভাপতি ও কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনির কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বকোণকে বলেন, মতিঝর্ণা এলাকায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস রয়েছে। যখন ভবন-ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, তখন তো কেউ বাধা দেয়নি। প্রশাসন সারা বছর নিশ্চুপ থাকেন বর্ষা আসলে উচ্ছেদের তোড়জোড় শুরু করেন। এখানে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ও এতিমখানা রয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলে বিপুল সংখ্যক লোক কিভাবে দিনযাপন করবে। তিনি দাবি করেন, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে বৈধভাবে মিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দু-একটি অবৈধ সংযোগ থাকতে পারে। তা আমরা চিহ্নিত করে প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছি।
জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিল পরিশোধ করা হয়েছে এমন পাঁচ শতাধিক বিলের কপি আদালতকে দেখানো হয়েছে। তা দেখানোর পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ট্রান্সফর্মারটি আমার জিম্মায় দিয়ে যান। অবৈধ সংযোগ না দেওয়ার শর্তে তা জিম্মায় নিয়েছি আমি।’
পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের ঘরে শত শত মিটার সংযোগ রয়েছে। পুরোনো মিটার ছাড়াও প্রি পেইড মিটারও লাগানো হয়েছে। সরকারি পাহাড় দখল করে এসব বস্তি ও ঘর নির্মাণ করা হলেও প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ, ওয়াসার পানি ও গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ চলে আসছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এই বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি। তিন সংস্থার গুটিকয়েক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদেও যোগসাজশে বছরের পর বছর অবৈধভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে অভিযানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের খুলশী বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের উপ সহকারী প্রকৌশলী আদম আলী। এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোর্ডের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারব না আমি। তথ্য জানা থাকলেও দেওয়ার অনুমতি বোর্ড আমাকে দেয়নি। আপনি আমাদের জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিতে পারেন।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টাকা দিয়ে ট্রান্সফর্মার, মিটার ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছে। প্রতি মাসে বিল নিয়ে যান তারা। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে বকশিসও নিয়ে যান।
জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্র জানায়, মতিঝর্ণা পাহাড়ে দু শতাধিক পরিবারের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিপুল পরিমাণ পানির সংযোগ লাইনের পাইপ কেটে নেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে স্থাপন করা বিদ্যুতের ৫৮টি মিটার খুলে নেয়া হয়েছে।
তবে দুপুর ১২টার দিকে অবৈধভাবে বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মা খোলার চেষ্টা করার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এসএম ইব্রাহিম, মহিলা কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনি উচ্ছেদের কাজে বাধা দেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় ইব্রাহীমকে আটক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এসময় দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম। মাসুম আদালতের কাছে দাবি করেন, ‘সামনে রমজান। এতগুলো মানুষের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে সমস্যা হবে। অবৈধ সংযোগ থাকলে তা বিচ্ছিন্ন করেন। তবে বৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে মানুষ কষ্ট পাবে।’
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতার যৌথ বাধায় ট্রান্সফর্মার বিচ্ছিন্ন না করে স্থানীয় মহিলা কাউন্সিলর এবং আ.লীগ নেতার জিম্মায় দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের দাবি ছিল, বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মারটি তাদের টাকায় স্থাপন করেছে। তাই ট্রান্সফর্মারটি খুলতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
অভিযানের নেতৃত্ব দেন, চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফোরকান এলাহী অনুপম, সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইসমাইল হোসেন, বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা আফরিন মুস্তাফা ও কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একটি গভীর নলকূপের পাইপ কেটে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় দুই শতাধিক পরিবার পাহাড় ছেড়ে চলে যায়। তবে বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মারটি সিজ করতে চাইলে মহিলা কাউন্সিলর, আওয়ামী লীগ নেতা মাসুম এসে বিদ্যুত বিল পরিশোধের কাগজপত্র নিয়ে হাজির হন। তবে এসব বিলের কপিতে হোল্ডিং নাম্বার না থাকায় বৈধ কিনা সন্দেহ হয়েছে। বিষয়টি দেখার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরে কাউন্সিলরের জিম্মায় ট্রান্সফর্মারটি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন পূর্বকোণকে বলেন, ‘১৫/২০ বছরের পুরোনো লাইন। এখন বৈধ না অবৈধ-আমি কিভাবে তা প্রমাণ করব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হোল্ডিং নাম্বার ছাড়া আমরা মিটার সংযোগ দিচ্ছি না। তবে হোল্ডিং নাম্বার না থাকলেও অনেক সময় মানবিক কারণে আমরা সংযোগ দিই। তবে প্রতিটি সংযোগের বিপরীতে একাউন্ট নাম্বার রয়েছে। বিলের টাকা ওই একাউন্টে জমা হচ্ছে।’

The Post Viewed By: 182 People

সম্পর্কিত পোস্ট