চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

পথশিশুদের টাকায় পকেটভারী

মিজানুর রহমান

২০ মে, ২০২৩ | ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

শিশু ইমনের (ছদ্মনাম) বয়স ১২ বছর। বাসা আমবাগান হলেও মায়ের কর্মসূত্রে কুলি হিসেবে কাজ করে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে। এই কাজে প্রতিদিন তার আয় হয় ১০০-১৫০ টাকা। কখনও কখনও আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে আয়ের এই টাকা পরিবার বা নিজের জন্য ব্যয় করে না সে। পুরো টাকা খরচ করে দোকানে ভিডিও গেমস খেলে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে ৯ বছরের শিশু রাজিবের (ছদ্মনাম) মা। গত বছর মা চট্টগ্রামের বাইরে যাওয়ার পর বাকলিয়ায় মামার বাসা থেকে পালিয়ে যায় সে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে কুলির কাজ শুরু করে। ট্রেনযাত্রীদের লাগেজ টেনে তার আয় হয় ২০০-৩০০ টাকা। ইমনের মতো রাজিবও তার আয়ের পুরো টাকা খরচ করে দোকানে ভিডিও গেমস খেলে।

শুধু ইমন বা রাজিব নয়- সহজলভ্যতার কারণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে থাকা প্রায় সব পথশিশুদের আসক্তি বাড়ছে ভিডিও গেমসের প্রতি। মাদকের পাশাপাশি ভিডিও গেমসেও আসক্তি বাড়ায় খরচ যোগাতে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে এই পথশিশুরা। ফলে এই এলাকার পথশিশুদের জন্য নেওয়া সামাজিক সংগঠনগুলোর নানা পুনর্বাসন কর্মসূচি কাজে আসছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাখি গলিতে বেশ কয়েকটি ভিডিও গেমসের দোকান আছে। এসব দোকানে ঘণ্টা প্রতি ৫০ টাকায় ভিডিও গেমস খেলা যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিডিও গেমসের দোকানগুলোতে ভিড় থাকে স্টেশনের পথশিশুদের। ভিডিও গেমসের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা শিশুদের জন্য নানা অফারও দেওয়া হয় এখানে। পাখি গলির নিজামের দোকানে নিয়মিত ভিডিও গেমস খেলা পথশিশু ইমাম (ছদ্মনাম) জানিয়েছে- প্রথমে ৫০ টাকা দিলে তাকে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এরপর একটি স্মার্ট মোবাইল দেওয়া হয়। যেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও গেমস ‘ফ্রি ফায়ার’ বা ‘পাবজি’ ইনস্টল করা থাকে। খেলার জন্য ঘণ্টায় ৫০ টাকা দিতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা গেমস খেলে সে।

প্রতিনিয়ত একাকী সময় কাটানোর ফলে, গেমসে আসক্ত শিশুরা সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠছে বলে মনে করেন প্যারেন্টিং গবেষক শ্যামল আতিক। তার ভাষ্য, বেশিরভাগ ভিডিও গেমসের কন্টেন্টের মূল বিষয় সহিংসতা। কীভাবে মানুষ মেরে একটি অঞ্চলকে দখল করতে হবে, প্রতিপক্ষকে গুলি করে বা বোমা মেরে নিঃশেষ করতে হবে- এসব।

‘গেমসে ক্রমাগত সহিংসতা বা মারামারির দৃশ্য দেখতে দেখতে শিশুরা এটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। ভার্চুয়াল জগতে মানুষ হত্যা করতে করতে তাদের মানবিক গুণটি আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়। এর সঙ্গে যদি হতাশা, মানসিক সমস্যাসহ অন্য কোনও সমস্যা যুক্ত হয়, তা ভয়াবহ বিপর্যয় ঢেকে আনতে পারে,’ যোগ করেন এই প্যারেন্টিং গবেষক।

মাদকের চেয়েও ভিডিও গেমসে পথশিশুদের আসক্তি ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা। তাদের একজন আলোর আশা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার এলাহী ফয়সাল। তিনি বলেন, মাদকের পাশাপাশি পথশিশুদের বিপথগামী করছে ভিডিও গেমসে আসক্তি।

ফয়সাল বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ‘পড়াশোনার বিনিময়ে খাবার’ কর্মসূচি হাতে নিই আমরা। কিন্তু অনেকে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করায় পথশিশুরা এখন শিক্ষামুখী হচ্ছে না। ভিডিও গেমসের নেশায় তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কুলির কাজ বা ভিক্ষা করে যা আয় করছে পুরোটায় মাদক বা ভিডিও গেমসের পেছনে ব্যয় করছে পথশিশুরা।

জানতে চাইলে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির বলেন, পাখি গলিতে কিছু ভিডিও গেমসের দোকান আছে বলে শুনেছি। এসব দোকান নিয়ম-নীতি মেনে চলছে কিনা আমরা খোঁজ নিয়ে দেখবো। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক বলেন, টাকার বিনিময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও গেমস খেলায় আসক্তি বিপদ ডেকে আনতে পারে। টাকার বিনিময়ে শিশুদের ভিডিও গেমসে প্রলুব্ধ করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্বকোণ/এ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট