চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪

সর্বশেষ:

এমআরআই সেবা মিলছে না সরকারি হাসপাতালে, নিরূপায় রোগীরা যাচ্ছেন বেসরকারিতে

ইমাম হোসাইন রাজু

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

রফিক উদ্দিন। দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত এ যুবকের চিকিৎসার জন্য এমআরআই পরীক্ষার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। স্বল্প খরচ হওয়ায় প্রথমেই দ্বারস্থ হন চমেক হাসপাতালে। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালটির একমাত্র এমআরআই মেশিন অকেজো হওয়ায় ফিরে যেতে হয় তাকে। বাধ্য হয়েই সরকারি খরচের তিনগুণ বেশি দিয়ে বেসরকারি ল্যাব থেকে পরীক্ষা করাতে হয় রফিক উদ্দিনের।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহত্তর চট্টগ্রামের রোগীদের সেবার জন্য সরকারিভাবে উচ্চক্ষমতার ম্যাগনেটিং রিজোনেন্স ইমেজিং বা এমআরআই মেশিন রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু দুটি হাসপাতালের মেশিন দুটি বছরের পর বছর অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এরমধ্যে চার বছর ধরে সেবা বন্ধ রয়েছে জেনারেল হাসপাতালে আর এক বছর চমেক হাসপাতালে।

 

সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, মেশিন দুটি সচলের জন্য একাধিকবার চিঠি চালাচালি করা হলেও এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন সুরাহা হয়নি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোটি টাকার উপর ব্যয় বিবরণীয় দেয়া হলেও সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত না থাকায় সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। পাশাপাশি দীর্ঘদিন অচল থাকায় মেশিনের অন্যান্য যন্ত্রাংশও নষ্ট হতে চলেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এতে হাসপাতালের রোগীদের বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

 

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে সেবা কার্যক্রম শুরু হয় চমেক হাসপাতালের নতুন এমআরআই মেশিনের। প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের জাপানি ‘হিটাচি ১.৫ টেসলা’র অত্যাধুনিক মেশিনটি সরবরাহ করেন ঢাকার মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেড নামের এক প্রতিষ্ঠান। ক্রয়ের চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের ওয়ারেন্টি ছিল মেশিনটির। কিন্তু তিন বছর যেতে না যেতেই ত্রুটি শুরু হয় কোটি টাকা মূল্যের এ মেশিনটির। এরমধ্যে ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর বিকল হয় মেশিনটি। এছাড়া আরও কয়েকবার ছোটখাট ত্রুটি দেখা দেয় মেশিনটির। সর্বশেষ গেল বছরের মে মাসে এসে বিকল হয়ে পড়ে মেশিনটি। যার কারণে অদ্যাবদি সেবা বন্ধ রয়েছে।

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘ত্রুটির কারণে একমাত্র এমআরআই মেশিনটির সেবা দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। সচলের জন্য একাধিকবার চিঠি চালাচালি করা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও এসে দেখেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন সুরাহা হয়নি।’

 

এক প্রশ্নের জবাবে চমেক হাসপাতালের পরিচালক শামীম আহসান বলেন, ‘বৃহত্তর চট্টগ্রামের রোগীদের ভরসাস্থল হচ্ছে চমেক হাসপাতাল। এখানে যারা সেবা নিতে আসেন তাদের সিংহভাগই হচ্ছেন গরীব রোগী। বাড়তি খরচ দিয়ে বাইরে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাটাও কষ্টসাধ্য। খবর পেয়েছি- শুধু চমেক হাসপাতালের মেশিনটি নয়, একই সঙ্গে ঢাকা ও রাজশাহীতে সরবরাহ করা দুটি মেশিনও অকেজো হয়ে পড়ে আছে বলে খবর পেয়েছি। পুরাতন মেশিনের বাইরেও আমরা নতুন মেশিন চেয়েছি। তবে আশা করছি নতুন মেশিন পাওয়া যাবে।’

 

অন্যদিকে, ২০১৫ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এমআরআই মেশিনটি স্থাপন করা হয় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। স্থাপন করার পর তিন-চার বছর সচল থাকলেও ওয়ারেন্টির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরপর মেশিনটিও অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালে অকেজো হওয়া মেশিনটিও আজ পর্যন্ত সচল করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে এ হাসপাতালটিতেও সেবা মিলছে না রোগীদের।

 

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকেই একমাত্র এমআরআই মেশিনটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার মেশিনটি সচল করতে একাধিকবার চিঠি প্রেরণ করেছি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরাও এসে ত্রুটি চিহ্নিত করে একটি খরচের বিবরণী দিয়েছেন। সেটি আবার নিমিউ এন্ড টিসিতে (সরকারি প্রকৌশল বিভাগ) পাঠানো হয়েছে। তারা দেখে সিদ্ধান্ত দিলেই কার্যক্রম শুরু হবে। যদিও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এক কোটি টাকার উপর খরচ হবে বলে জানিয়েছিল। তবে এখন স্বাস্থ্য দপ্তরের সিদ্ধান্তের জন্যই আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’

 

প্রসঙ্গত: শরীরের বিভিন্ন অংশের সুক্ষ্ম রোগ নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে এমআরআই একটি নির্ভরযোগ্য যন্ত্র হিসেবে চিকিৎসকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।  মস্তিষ্ক রোগ (টিউমার, স্ট্রোকসহ সব), মেরুদণ্ড, জয়েন্ট (হাঁটু, কাঁধ, কব্জি, এবং গোড়ালি), পেট, স্তন, রক্তনালী, হার্ট এবং শরীরের অন্যান্য অংশের পরীক্ষার জন্য এমআরআই ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রামের দুই সরকারি হাসপাতালেই এ সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু মেশিন অকেজো থাকায় সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন