চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১৫ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

সোলাইমান বাদশার রাজত্ব জিইসি থেকে ষোলশহর

ফুটপাতে চাঁদাবাজি- অপহরণ- ছিনতাই- ভাড়াটে সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসা সব অপকর্মের হোতা সোলাইমান বাদশা। নগরীর দুই নম্বর গেইট থেকে অক্সিজেন মোড় অবধি রাজত্ব তার। একাধিকবার জেলে গেলেও জামিনে বের হয়ে ফের একই অপরাধে জড়ায় সোলাইমান। দুই যুবককে অপহরণ করে চাঁদা দাবি করার অপরাধে গত রবিবার সোলাইমান বাদশাকে ফের গ্রেপ্তার করেছে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। গত বছরের ১৬ এপ্রিল জলাবদ্ধতা প্রকল্পের দুই শ্রমিককে অপহরণের পর চাঁদা দাবির অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। সোলাইমান পাঁচলাইশ থানার ষোলশহর দুই নম্বর গেইট গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকার আবু তাহেরের ছেলে।

 

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (ওসি) নাজিম উদ্দিন মজুমদার জানান, গত ৮ নভেম্বর ইমাম হোসেন মানিক ও সোহেল নামে দুই বন্ধুকে অপহরণ করে ফ্লাইওভারের নিচে একটি রুমে আটকে রাখে। মানিকের মা রোকেয়া বেগম থানায় এসে বিষয়টি জানালে পুলিশ গিয়ে বায়েজিদগামী ফ্লাইওভারের নিচে একটি কক্ষের তালা ভেঙ্গে মানিক ও সোহেলকে উদ্ধার করে। ওই কক্ষ থেকে রায়হান (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। একাধিক মামলার আসামি সোলাইমান বাদশার অনুসারী রায়হান দুই নম্বর গেট মসজিদ গলির মৃত মো. ইসহাকের ছেলে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দুই বন্ধুকে ষোলশহর এলাকা থেকে অপহরণ করে ফ্লাইওভারের নিচে ওই কক্ষে আটকে রাখে সোলাইমান বাদশা ও তার অনুসারীরা। তারা দুই বন্ধুর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

 

ওসি নাজিম উদ্দিন জানান, মামলায় সোলাইমান বাদশাকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। সোলাইমান এর আগেও অপহরণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কারাভোগ করে। রবিবার সন্ধ্যায় তাকে দুই নম্বর গেইট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে গতকাল (সোমবার) আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।

 

জিইসির মোড় ও ষোলশহর এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ক্ষমতাসীন দলের একজন কাউন্সিলরের ছত্রছায়ায় থেকে নানা অপকর্ম করে বেড়ায় সোলাইমান বাদশা। জিইসির মোড় এলাকা থেকে ষোলশহর পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদাবাজি করে সোলাইমান বাদশা। দুই নম্বর গেইট থেকে অক্সিজেনগামী টেম্পো থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেয় সে। ফিনলে শপিং সেন্টারের গলিতে থাকা প্রায় ৪০টি ভ্যান থেকে দৈনিক ১১৫ টাকা করে মাসে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা চাঁদা তুলে সোলাইমান।

 

এছাড়া, ষোলশহর স্টেশন, তুলাতুলি, সিগনাল এলাকা, আল ফালাহ গলি, মেয়র গলিসহ আশপাশ এলাকায় মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাদাঁবাজি, দখল বেদখল, অপহরণ, অবৈধ গেস্ট হাউস, অস্ত্র ব্যবসা, ভাড়াটে খুন করাসহ সব কিছুতেই তার গ্রুপের কেউ না কেউ জড়িত থাকে। ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলে না। নাসিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ফ্লাইওভারের নিচে সোলাইমানের একটি নার্সারিও রয়েছে। নার্সারি সংলগ্ন একটি কক্ষও তৈরি করে, সেখানে লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে এমন অভিযোগও রয়েছে সোলেমানের বিরুদ্ধে।

 

ব্যবসায়ী ও ভাসমান হকারার জানান, চাঁদা তুলতে সোলাইমান বাদশার নিজস্ব গ্রুপ রয়েছে। যেমন- রবিউল হোসেন তুহীন, রায়হান, ইসমাইল হোসেন, তৌহিদুল ইসলাম, মিঠু, ইয়াছিন ভুঁইয়া, কালা শামীম, ফারুক ও আসিফসহ আরো বেশ কয়েকজন রয়েছে যারা সোলাইমান বাদশার হয়ে ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। যেমন- ইয়াছিন জিইসি থেকে সানমার পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তুলে। রবিবারের অপহরণের ঘটনায় ইসমাইল, মিঠু, তৌহিদুলসহ আরো ৪/৫ জন জড়িত ছিল।

 

অনুসারীদের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার ওসি জানান, যাদের কথা বলা হচ্ছে তাদেরকে অপহরণ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নাছিম উদ্দিন সোহেল হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সোলাইমান বছরের বছর ধরে ওই এলাকায় নানা অপরাধ করে বেড়ালেও তার গায়ে তেমন আঁচড় লাগেনি।

 

২০১৮ সালে দুই নম্বর গেইটে এএসআই মালেককে গুলি করেছিলো সোলাইমানের অনুসারী কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। অভিযোগ উঠেছিলো ওই ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি ছিল সোলাইমানের। পরবর্তীতে এএসআই মালেক হত্যাপ্রচেষ্টা মামলায় তার অনুসারী খোকন চৌধুরীসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হলেও রহস্যজনক কারণে সোলাইমানকে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বাদ দেয়া হয়।

 

২০২১ সালের ১৬ এপ্রিল তুলে নিয়ে চাঁদাদাবি করলে তাকে গ্রেপ্তার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। উদ্ধার হওয়া শ্রমিক মিজান ইসলাম ও গোলাম রাব্বানি আদালতে এ ব্যাপারে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট