চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

শিক্ষা অফিসারের দুর্নীতির তথ্য দিয়ে ‘চাকরি হারাচ্ছেন’ শিক্ষিকা!

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের ঘুষ ও দুর্নীতির তথ্য দুদকে দিয়ে ‘চাকরি হারাতে বসেছেন’ চট্টগ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। দুদকের কাছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ করা হয়েছে, তার জন্য ইতোমধ্যে খোদ শিক্ষা বিভাগই উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ঠুকেছেন বিভাগীয় মামলা। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার ফরহাদাবাদ নূর কাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার।

এদিকে, দুদকে অভিযোগকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করায় দুদকসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। যদিও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের দাবি তিনি ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই করেছেন’। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা বিভাগের এমন কর্মকাণ্ডে ভবিষ্যতে অন্ধকার নেমে আসবে। তাই ওই শিক্ষিকাকে হয়রানি না করে বরং তাকে পুরষ্কার করার কথাও বলছেন কেউ কেউ।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ঘুষের ১০ হাজার টাকাসহ ফটিকছড়ির উপজেলা শিক্ষা অফিসার আজিমেল কদরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে দুদক। এ ঘটনায় দুদকের তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। দুদক তদন্ত শেষে আদলতে চার্জশিটও দাখিল করে।

যদিও এ নিয়ে শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে একটি বিভাগীয় মামলাও ওই সময়ে রুজু হয়। কিন্তু চলতি বছরের গত ১৪ সেপ্টেম্বর সেই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় আজিমেল কদরকে। উল্টো অভিযোগ দাখিল করায় প্রাথমিক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে উল্লেখ করে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী চাকরি থেকে কেন বরখাস্ত করা হবে না তার জবাব দিতে ভুক্তভোগী শিক্ষিকার কাছে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম।

এসব প্রসঙ্গে ভুক্তোভোগী সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার পূর্বকোণকে বলেন, ‘দুদকের কাছে কেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি, সে কারণে আমাকে এখন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অভিযোগ করায় উল্টো আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছি, এরপরও আমাকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। আমি খুবই মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুব আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমি শিক্ষিকা হয়েও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তাহলে আমি শিক্ষার্থীদের আদর্শিক শিক্ষা কীভাবে দেব? আমি এ হয়রানি থেকে বাঁচতে চাই। আমি সুষ্ঠু বিচার প্রার্থনা করছি।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করা হয়েছে। এর বাইরে আমি আর কিছুই জানি না। আমি যা করেছি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করেছি। আর আজিমেল কদরের বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টিও মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। আমাদের পক্ষ বলা সম্ভব নয়।’

এদিকে, প্রতিকারের বদলে চাকরি হারাতে বসা প্রাথমিক শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার আইনি সহযোগিতা চেয়ে আলোচ্য বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি দুদকের চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাত। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষিকা হয়রানির বিষয়টি দুদকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। আমরাও তা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছি।’

অন্যদিকে, আলোচ্য এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে সচেতন নাগরিক সমাজ ও টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি এডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে দুদকের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত। এরপরও শিক্ষা বিভাগ কীভাবে দায়মুক্তি দিল তা বোধগম্য নয়। আর যিনি অভিযোগকারী, তার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করাটাও একটা অন্যায়। এভাবে চলতে থাকলে কেউই দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না। আর তাতে প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী জিরো টলান্সের নীতিও বাস্তবায়ন হবে না।’

শিক্ষার মতো একটি পবিত্র বিভাগের এমন কর্মকাণ্ড জাতির ভবিষ্যত পুরোপুরি অন্ধকারে নিয়ে যাবে উল্লেখ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা এড. আকতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘এখন অভিযোগকারীকে সর্বাত্বক সহযোগিতা করা দুদকের দায়িত্ব। এছাড়া সাহসী এই শিক্ষিকাকে রাষ্ট্রকেও নিরাপত্তা দেয়ার প্রয়োজন আছে। আর শিক্ষা বিভাগের যারা এমন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালীরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠবে।’

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট