চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

তেলের বর্জ্যে দামি ব্র্যান্ডের ঘি

৫ এপ্রিল, ২০২২ | ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী পৌরসভার পশ্চিম গোমদন্ডীতে এইচএস ফুড প্রোডাক্টের সোনালি ব্র্যান্ড নামে ঘি তৈরির কারখানার অনুমোদন রয়েছে বিএসটিআই’র। কিন্তু সরেজমিনে খোঁজ করে কারখানাটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। বোয়ালখালী পৌর মেয়র জহুরুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘পশ্চিম গোমদন্ডীর আমতলা এলাকায় একটি ঘি তৈরির কারখানা ছিল। তা এখন নেই। কোথায় গেছে তাও জানি না’।

নগরীর বাকলিয়ার ঠিকানায় রয়েছে এমআর কনজ্যুমার প্রোডাক্টস কোম্পানির পাকোয়ান ব্র্যান্ডের ঘি। কৌটার গায়ে ঠিকানা রয়েছে নোমান কলেজ রোড, শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক, বাকলিয়া। এ ঠিকানা ধরে খোঁজ নেয়া হলেও কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও সন্ধান মিলেনি।
বাকলিয়া বাস্তুহারা বস্তি সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘নোমান কলেজ এলাকায় কয়েকটি কারখানা রয়েছে। তবে এসব কারখানায় কী তৈরি হয় জানি না। লোকজনের আনাগোনা দেখা যায় না। ঘি তৈরির কারখানার সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি’।

বিএসটিআই আইন বলছে, পণ্যের কৌটার গায়ে যে ঠিকানা রয়েছে সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম বাধ্যতামূলক। অন্য কোথাও উৎপাদন পরিচালনা করা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইন মানে কে? এ বিষয়ে দেখভালে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই যেন এ বিষয়ে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। ঘি তৈরির অনুমোদন দিয়েই দায় সেরেছে বিএসটিআই।
সাতকানিয়া নয়া রাস্তার মাথা এলাকার নাজিম উদ্দিন নিজেকে পাকোয়ান ব্র্যান্ডের ঘি’র ডিলার বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, বাকলিয়া নোমান কলেজ এলাকায় কারখানা রয়েছে। কোন এলাকায় তা বলেননি তিনি।

বিএসটিআইয়ের উপ-পরিচালক নূরুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘কৌটার গায়ে যে ঠিকানা রয়েছে, সেই ঠিকানায় কারখানা থাকতে আইনিভাবে বাধ্য’। সরেজমিনে না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনার কাছে তথ্য থাকলে আমাদের দিয়েন। ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়ে কী ধরনের ঘি তৈরি করছে তা দেখভালো করার দায়িত্ব আপনাদের। তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে কাজ করতে হয়। তারপরও আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছি’।

বিএসটিআইয়ের তালিকায় দেখা যায়, চট্টগ্রামে ঘি তৈরির ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেই তালিকা ধরে একাধিক কারখানার সরেজমিন খোঁজ নেওয়া হয়। বেশির ভাগ কোম্পানির ঠিকানা কৌটায় লিখা অনুযায়ী খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিএসটিআই অনুমোদিত ঘি কারখানার সন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে নামে-বেনামে অবৈধ কারখানা। বিএসটিআইয়ের তালিকায় না থাকলেও হাটে-বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভুঁইফোড় কোম্পানির নামে অবৈধ ও ভেজাল ঘি। নগরী ও জেলায় শতাধিক অবৈধ ঘি তৈরির কারখানা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানায়। একাধিক ঘি’র কৌটা সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সবকটি কৌটার গায়ে বিএসটিআইয়ের লোগো ও বিএসটিআই অনুমোদিত বলে লিখা রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

বান্দরবান সদরের রেইছা এলাকার ঠিকানায় বিক্রি হচ্ছে মধুমতি ব্র্যান্ডের ঘি। সূত্র জানায় সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকায় তৈরি করা হয় এ ব্র্যান্ডের ঘি। এটির মালিক এজাহাজার মেম্বার নামে এক যুবলীগনেতা। এজাহারের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি তা রিসিভ করেননি। নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকায় কারখানা ও খাতুনগঞ্জ আমির মার্কেটে অফিস ঠিকানা ব্যবহার করে বাজারজাত করা হচ্ছে আরশী ব্র্যান্ডের ঘি। রুবেল তালুকদার নামে একজন নিজেকে ডিলার দাবি করে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে কারখানা। সরকারি অনুমোদন রয়েছে বলে কাগজপত্র দেখানোর পর ঘি বিক্রি করছি। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন না থাকার বিষয়টি জানা নেই’।

চট্টগ্রাম নগরীতে ভালো চাহিদা রয়েছে রাজরাণী ব্র্যান্ডের ঘি। বিশেষ করে বাবুর্চিদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এ ব্র্যান্ডের ঘি। কিন্তু বিএসটিআইয়ের হালনাগাদ তালিকায় এ ব্র্যান্ডের নাম নেই। রাজরাণী ঘি’র কৌটায় থাকা মোবাইল নম্বারে গত শনিবার ও গতকাল সোমবার একাধিকবার কল দেওয়া হলেও কেউ রিসিভ করেননি। এছাড়াও তাহের ফুড প্রোডাক্টসের ডানোফা ব্র্যান্ডের ঘি’র চাহিদাও ভলো রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও নকল ঘি। বৈধ কোম্পানির আড়ালেও তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের ঘি। বাজারে বেশ দাপটের সঙ্গে বেচা-বিক্রি হচ্ছে এসব ঘি।
বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক শশী কান্ত দাশ পূর্বকোণকে বলেন, ‘১৭ টি লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে’। লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া কোম্পানির ঘি কিভাবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের ডিডি স্যার বলতে পারবেন’।

ঘি তৈরির একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানালেন, ভোজ্যতেলের বর্জ্য, সাবানের ফেনা, জুতার গাম, পামওয়েল, সয়াবিনের সঙ্গে রঙের ফ্লেভার ও কেমিক্যাল মিশিয়ে নিম্নমানের ঘি তৈরি করা হয়। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। কম খরচে তৈরি নিম্নমানের ভেজাল ঘি নামিদামি ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হয় বেশি দামে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী পূর্বকোণকে বলেন, নকল ও ভেজাল ঘি কেজিপ্রতি ৮শ টাকায় বিক্রি করা হয়। কিন্তু উন্নতমানের ঘি তৈরিতে আট থেকে সাড়ে আট শ টাকা খরচ পড়ে। এতে বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো মার খাচ্ছে। বিএসটিআই’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসোহারা নিয়ে নিশ্চুপ রয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে ভোক্তারা।
বনফুল এন্ড কোম্পানির জিএম আমানুল আলম পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ভেজাল ও নিম্নমানের ঘি তৈরি করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমরা বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসনকে মৌখিকভাবে অবহিত করেছি। কিন্তু কেউ তো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি’।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন পূর্বকোণকে বলেন, ‘বৈধ কারখানারও অস্তিত্ব মিলে না। কোথায় তৈরি হয় তার খোঁজ নেয় না বিএসটিআই। তদারকির অভাবে ভেজাল ও মানহীন ঘি’য়ে সয়লাভ হয়ে গেছে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর বাকলিয়া, ষোলশহর বিসিক শিল্প এলাকা, চাক্তাই-রাজাখালী, নাসিরাবাদ, বায়েজিদ, পাহাড়তলী এবং জেলার পটিয়া, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠেছে ভেজাল ঘি’র কারখানা। টিন ও প্লাস্টিকের কৌটার গায়ে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করেই নিম্নমান-ভেজাল ঘি তৈরি এবং বাজারজাত করা হচ্ছে। বিএসটিআই অনুমোদিত অনেক কারখানায়ও তৈরি হচ্ছে ভেজাল ও নিম্নমানের ঘি।

গত বছর আনোয়ারা ও হাটহাজারী উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল ঘি আটক করেছিল প্রশাসন। এসব ভেজাল ও অবৈধ কারখানায় বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করে ঘি তৈরি করা হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাস দু-এক আগেও আনোয়ারার একটি কারখানায় ঘি তৈরি করা হয়েছিল। এখন বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের নজর এড়াতে রোজার আগেই ঘি তৈরি ও মজুত করা হয়েছে।
দেখা যায়, নোংরা-অপরিচ্ছন্ন ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ঘি তৈরি করা হয়। অথচ কৌটায় লিখা রয়েছে, আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গাভির খাঁটি দুধের ক্রিম দিয়ে তৈরি হয়। চটকদার বিজ্ঞাপন ও বিএসটিআইয়ের লোগো সাঁটিয়ে বাজারজাত করা হয়।

 

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট