চট্টগ্রাম বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সর্বশেষ:

ব্রেন সার্জারিতে অনন্য চমেকহা

১৮ মার্চ, ২০২২ | ১:১২ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

 

নেই পর্যাপ্ত জনবল। শয্যার সংকটে হিমশিম অবস্থা। অধ্যাপক আর তিনজন সহকারী অধ্যাপক থাকলেও সহযোগী অধ্যাপক নেই দীর্ঘদিন ধরে। আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ আছে নানান সংকট আর সীমাবদ্ধতাও। কিন্তু এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও সফলতার কমতি নেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের। মানুষের ব্রেন সার্জারি আর সেবাদানে সাধারণ মানুষের আস্থায় ঠাঁই নিয়েছে এ বিভাগটি। যার ফলে চট্টগ্রাম ছাড়াও বিভাগের বাকি ১০ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জটিল ও দুরারোগ্য নানান সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা ছুটে আসছেন বৃহৎ সরকারি এ হাসপাতালে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৪৫ শয্যার ওয়ার্ডটিতে গড়ে রোগী ভর্তি থাকে দুই শতাধিক। শয্যা না পেলেও ফ্লোর আর বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। তবে কষ্টকর হলেও সেবা আর সফল অস্ত্রোপচারের দিক থেকে অনন্য স্থানে আছে এ বিভাগ। এর মধ্যে মাত্র একটি অপারেশন থিয়েটারেই গড়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ জনের অস্ত্রোপচার হচ্ছে এখানে। বছর শেষে যা হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, মাথায় আঘাত, ব্রেন টিউমারসহ নিউরো সার্জারি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার ব্যয়বহুল হলেও সরকারি এ হাসপাতালে তা স্বল্পমূল্যেই করা হচ্ছে। যার ফলে জনসাধারণের জন্য চমেক হাসপাতালের এ ওয়ার্ডটি এখন গুরুত্ব অনেক বাড়িয়েছে। যদিও নানান সংকট ও সমস্যায় দিনাতিপাত করছে সাফল্য লাভ করা এই বিভাগটি। তবুও থেমে নেই মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ।
এই যেমন, সম্প্রতি সবচেয়ে আলোচিত মেডিকেল শিক্ষার্থী মাহাদী জে আকিবের সফল অস্ত্রোপচার হয় এ নিউরো সার্জারি বিভাগেই। মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত এ শিক্ষার্থীর অবস্থা এমন ছিল, চিকিৎসকদের ভাষ্য- অপারেশনের তড়িৎ সিদ্ধান্ত না নিলে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়তে পারতো আকিব। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সফল অস্ত্রোপচারসহ মাত্র কিছুদিন চিকিৎসায় থেকে এখন পুরোপুরিই সুস্থ বলা চলে। পুরোপুরি না হলেও এখন স্বাভাবিক জীবন যাপনই করছে আকিব। হাসি-তামাশায় বোঝার উপায় নেই, তার মাথায় হাড় নেই কিংবা বড় ধরনের অস্ত্রোপচার চালানো হয়েছে মাথায়।
শুধু আকিবই নয়, ব্রেনের মতো খুবই সূক্ষ্মস্থানে এমন অস্ত্রোচারের সংখ্যা বছরে হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে এ বিভাগে। জুনিয়র চিকিৎসক আর শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়েই এমন হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ করে যাচ্ছেন বিভাগের চিকিৎসকরা। চট্টগ্রামের এ নিউরো সার্জারি বিভাগ এখন পর্যন্ত একের পর এক পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিনই সফলতার গল্পে নিজেদের নাম লিখিয়ে নিচ্ছেন বিভাগের চিকিৎসকরা। যার নেতৃত্বে দিচ্ছেন বিভাগের প্রধান।
নিউরো সার্জন বিশেষজ্ঞ ও বিভাগের প্রধান অধ্যাপক. ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, আর মানুষের শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে ব্রেন। সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই ব্রেন কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছেন। এরচেয়ে বড় প্রাপ্তির কিছুই নেই। একজন মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অসহায় অবস্থায় আমাদের কাছে ছুটে আসেন, গভীর আস্থা আছে বলেই প্রতিদিনই মানুষ ভিড় করছেন। সেই আস্থার জায়গা থেকেই আমরাও সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। এটাই আমাদের দায়িত্ব। তবে এটিও বলতে পারি, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের এ নিউরো সার্জারি বিভাগ এখন অনেক সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।’
প্রয়োজন নতুন ওটি স্থাপন ও জনবল
সাফল্যের সাথে নিউরো সার্জারি কার্যক্রম চললেও অনেকগুলো সীমাবদ্ধতার জন্য অপারেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিভাগ সংশ্লিষ্টরা। তারমধ্যে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ক্লিনার, ওয়ার্ড বয়সহ নানা সংকটের বড় সমস্যা। তারচেয়েও বড় সংকট হচ্ছে অস্ত্রোপচারের কক্ষ। মাত্র একটি অস্ত্রোচার কক্ষ দিয়েই বর্তমানে দিনে ৪ থেকে ৫ জনের বেশি অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে সময়মতো জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলেও তা করতে না পেরে শঙ্কিত থাকেন রোগী ও স্বজনরা। তবে এ কক্ষ বাড়ানো গেলে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা যেমন বাড়বে, মাসের পর মাস রোগীদেরও অপেক্ষা করতে হবে না অপারেশনের জন্য।
নিউরো সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু এরপরও আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি চিকিৎসা দিতে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অপারেশন কক্ষ সমৃদ্ধ করে পাশাপাশি আরেকটি নতুন অপারেশন থিয়েটার বা ওটি স্থাপন হলে রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু এরজন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি পর্যাপ্ত জনবল। তাহলে সেবার মান যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি রোগীদেরও আর দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না।’

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট