চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সমস্যা সম্ভাবনা ও আমাদের করণীয়

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ১:১০ অপরাহ্ণ

ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম (এম এম আকাশ)

 

আমরা এমন একটি শিল্প নিয়ে কথা বলছি যা আমাদের রপ্তানির প্রায় ৭৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। যদিও নিট রপ্তানি আয় হিসাব করলে (অর্থাৎ আমদানিকৃত কাঁচামালের অংশ বাদ দিলে) এটি হ্রাস পেয়ে দাঁড়াবে সবনিম্ন ৩০ শতাংশে। (যদি আমরা ধরে নেই যে মোট রপ্তানি মুল্যের ৭০ শতাংশ ব্যয়িত হয় আমদানিকৃত কাঁচামাল তথা কাপড় এবং অন্যান্য অনুষঙ্গ দ্রব্যাদি আমদানির জন্য) তবে আমাদের দেশে একসময় প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল আমদানিকৃত ব্যয়। মাত্র ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন দিয়ে আমাদের এই পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে নানা ধরণের পশ্চাদবর্তী সংযোগ শিল্প গড়ে উঠেছে। ফলে অনুমান করা হয় যে বর্তমানে গড়ে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫০—৬০ শতাংশ পুনরায় বাইরে চলে যায়। ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন দিয়ে শুরু করে ১৯৮০ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে ৪০—৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনে পৌঁছানোর প্রবণতাটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে।
পোশাক শিল্পের দুটি শাখা রয়েছে ওভেন শাখা ও নিট শাখা। নিট শাখায় প্রযোজনীয় কাঁচামাল অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের হওয়ায় সেই কাপড় ক্রমবর্ধমান হারে দেশে তৈরি হচ্ছে এবং সেখানে তাই নিট রপ্তানির অংশ অপেক্ষাকৃত বেশি। সম্প্রতি কোটা উঠে যাওয়ার পর যেহেতু এ দেশের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির কাঠামো ক্রমাগত নিট শাখার দিকে ঝুঁকছে সে জন্য মোট রপ্তানিতে নিট শাখার উৎপাদনের অংশও বাড়ছে। ফলে মোট রপ্তানিতে আমদানির অংশও হ্রাস পাচ্ছে। কেউ কেউ তাই মনে করেন যে গড়ে এই মুহূর্তে হয়তো পোশাক শিল্পের মোট উৎপাদনে আমদানিকৃত কাঁচামাল বিষেশতঃ কাপড়ের/সুতার জন্য ব্যয়ের পরিমাণ সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ বা তার নিচেই নেমে গেছে। একথা সত্য হলে পোশাক শিল্পের সংযোজিত মূল্য দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। তখন মোট রপ্তানিতে এর নিট রপ্তানির অংশ দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ! দেশের মোট রপ্তানিতে ৭৭ শতাংশ বা নিট হিসাবে ৪৬ শতাংশ কোনটিই খুব অনুল্লেখযোগ্য নয়।
এছাড়া এই শিল্পের চরিত্র অত্যন্ত শ্রমঘন এবং প্রধানত মহিলারা এই শিল্পে নিয়োজিত আছেন। যা কিনা শিল্পখাতে মোট নিয়োজিত শ্রমিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশের সমান। চলতি হিসাবে দাবি করা হয় যে এই শিল্পে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ শ্রমিক নিয়োজিত আছেন (করোনার আগে তা ৪০ লক্ষ পর্যন্ত উঠেছিল বলে দাবি করা হতো!)।
বিবিএস এর একটি অনুপুংখ হিসাব এর ভিত্তিতে ২০০৪ সালে এসব শ্রমিকদের পেশা—লিঙ্গ—আবাসন বিন্যাসের একটি চমৎকার চালচিত্র পাওয়া যায়। হিসাবটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে আইএলও কর্তৃক প্রকাশিত “আর.এম.জি. ইন্ডাস্ট্রি, পোস্ট এমএফএ. রেজিম এন্ড ডিসেন্ট ওয়ার্ক” শিরোনামে গ্রন্থে।
আশা—নিরাশার দ্বন্দ্ব : বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন, প্রমুখ দেশের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা উপরোক্ত হতাশাবাদী চিত্রটিকে কিছুটা প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। আমার নিজের অতীত মতটিকেও এই নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা উচিত বলে মনি করি। ”পুঁজিবাদী পথে বিকাশ অসম্ভব” বা ”অপুঁজিবাদী পথে বিকাশের সম্ভাব্যতা”—র অতীত তত্ত্ব দুটিকে অন্তত পুনরায় খুঁটিয়ে পরীক্ষার সময় এসে গেছে।
অনেক দেশই একপেশেভাবে সংরক্ষিত শিল্প হিসাবে আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প গড়তে গিয়ে দেশের আয় বণ্টন আরো অসম করে ফেলেছে, বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নানরকম ভর্তুুকি ও লোকশানের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে, অদক্ষ মাথাভারি প্রশাসন ও অদক্ষ শিল্পের জন্ম হয়েছে। আবার অন্যদিকে যেসব দেশ নিজেদের শ্রমিকদের শিক্ষিত করতে পেরেছে, শৃংখলার মধ্যে এনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পেরেছে, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম জীবনধারন মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান শিক্ষা ও স্বাস্থের মৌলিক সুবিধাগুলি নিশ্চিত করতে পেরেছে তাদের পক্ষে ধাপে ধাপে শ্রমঘন রপ্তানি থেকে শুরু করে পঁুজিঘন ও দক্ষতা নির্ভর শিল্প ও সেবা পণ্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছে তারা। কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় বাজারের প্রসার ঘটেছে অন্যদিকে রপ্তানির প্রসারও অব্যাহত রয়েছে। কোন কোন দেশ পণ্য বা সেবা নয় সরাসরি দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি করে প্রচুর ধন উপার্জন করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও ক্রমে ক্রমে এসব দেশ তাদের প্রান্তিক অবস্থান পরিবর্তন করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং সেই সম্ভাবনা ক্রমশঃ আংশিক বা পরিপূর্ণ দৃশ্যমান বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। যদিও এই পথে পদে পদে প্রচুর বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে।
এই নতুন সম্ভাবনাকে সবচেয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে একটি রূপকের মাধ্যমে। একে বলা হয়েছে ফ্লাইং গিস মডেল। এই মডেল অনুযায়ী ভবিষৎবাণী করা হয় যে, সবেচেয়ে উন্নত দেশগুলি ক্রমাগত অধিকতর পঁুজিঘন পণ্য রপ্তানিতে ঝুঁকবে, ফলে ঠিক তাদের নিচে যে দেশগুলো আছে তারা তাদের শূন্যস্থান দখল করে নিতে সক্ষম হবে এবং এই ভাবে নিচের সারির দেশগুলি একে একে পরবর্তী ধাপে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে। তবে প্রথম এবং দ্বিতীয় সারির দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্বে দ্বিতীয় সারির দেশগুলোর বিজয় এবং একধাপ উপরে ওঠার মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়ার গঁষঃরঢ়ষুরহম ঊভভবপঃ চালু হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের উপরে যে দেশগুলো রয়েছে যেমন : চীন ও ভারত, তারা যদি নিচে নেমে বাংলাদেশের সঙ্গে সস্তা পোশাক উৎপাদন ও বিক্রযের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তাহলে বাংলাদেশের মত তৃতীয় সারির দেশগুলির পক্ষে এই মডেলের উত্তরণ ঘটানোর সম্ভাবনা কমে আসবে বা নাকচ হয়েও যেতে পারে। কিন্তু এ কথা এখনই কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে সব চেয়ে শ্রমঘন নিম্নস্তরের পোশাক উৎপাদক বাংলাদেশ কি কোটা ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে নিজের জন্য এক ধাপ উঁচুতে বিশেষ একটি স্থান বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, না কি নিচু উৎপাদনেই আটকে থাকবে? না কি আরো নিচে নেমে গিয়ে সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়বে? এটা নির্ভর করবে অসম বিশ্বায়নে আমরা কতটুকু নিজেদের জাতীয় সত্ত্বা ও মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারি। প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকতে পারাটাই হবে এখানে নিয়ামক উপাদান।
কোটাশূন্য পৃথিবীতে আভ্যন্তরীণ ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা :
২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ এবং সরকারপক্ষ একটি ত্রিপাক্ষিক আলোচনা সভায় মিলিত হন। ওই সভায় পঠিত প্রবন্ধাবলী এবং আলোচনার ধারা বিররণী প্রকাশিত হয়েছিল। ২০০৬ সালে আইএলও এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। ওই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত ও তথ্যগুলি আমি সংক্ষেপে নীচে তুলে ধরছি : ক) শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে যে বর্তমানে বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা (যেমন— বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব সেবা, বিনোদন, দুর্ঘটনা, বীমা ইত্যাদি) খুবই ন্যূনতম পর্যায়ে রয়েছে। এগুলির আরো উন্নতি ঘটাতে হে্ব। খ) মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায় যে, বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতির বিলুপ্তি পর ওভেন শাখায় অবনতি হলেও কোটামুক্তির কারণে নিট শাখায় অগ্রগতি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে পোশাক শিল্পখাতে উৎপাদন ও কর্মনিয়োজন কমেনি। তবে বৃদ্ধির হার প্রথমে কিছুটা হ্রাস পেলেও তা পুনরায় দ্রতই আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। গ) মালিকদের মতে তাদের কারখানাগুলিতে বাধ্যতামূলক দাস শ্রম বা শিশু শ্রম নেই। মহিলা ও পুরুষদের মধ্যে একই শ্রমের জন্য একই মজুরি প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বড় কারখানাগুলি যারা উন্নত মানের পোশাক তৈরি করেন তাদের পক্ষে শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষার অন্যান্য ব্যবস্থাগুলি যে মাত্রায় দেয়া সম্ভব, ছোট কারখানাগুলির পক্ষে সে মাত্রায় তা দেয়া সম্ভব হয় না। ঘ) সাধারনভাবে কোটামুক্ত প্রতিযোগিতার কারণে পোশাকের রপ্তানিমূল্য কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু তার ফলে পোশাক শিল্প অলাভজনক হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে না।
তবে মালিকরা কি আরো মজুরি কমিয়ে নতুন ভাবে এডজাস্ট করে মুনাফা ঠিক রেখে অগ্রসর হবে না কি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনের বহুমুখীকরণ ঘটিয়ে আরো উন্নত প্রবৃদ্ধি ও উন্নততর মজুরির দিকে যুগপৎ অগ্রসর হবে—এই প্রশ্নটি ওই সম্মেলনে তীব্রভাবে এবং বারে বারে বিভিন্ন পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়। ঘ) তিন পক্ষই স্বীকার করো নেয় যে বর্তমান উন্মুক্ত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকার জন্য চারটি ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হবে।
১) পণ্যের গুনগত মান বৃদ্ধি। ২) পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামুলক পর্যায়ে রাখা। অর্থাৎ পণ্যের দাম সহজে বৃদ্ধি করা যাবে না। ৩) লিড টাইম কমানো তথা অর্ডার নেয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অর্ডার সাপ্লাই নিশ্চিত করা। ৪) আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও ডিসেন্ট ওয়ার্ক এর স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করা। বিশেষত উন্নত দেশের ক্রেতারাসহ সারা বিশ্বেই এখন শ্রমিকদের জন্য “কমপ্লায়েন্স”—এর যে কথা বলা হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা।
“কোটাশূন্য প্রতিযোগিতা” বিষয়টি শুধু একটি হতাশা এবং সংকটের বিষয় হিসাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেখছেন না। তারা এটাকে দেখছেন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় এজেন্ডা হিসাবে। যদি বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে করণীয়গুলি দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে এবং শিল্পের শান্তি রক্ষা করে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে তাহলে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কিন্তু যদি আমাদের পুঁজিপতিরা লোভী কৃষকের মত স্বর্ণ ডিম্ব প্রসবিনী রাজহংসটিকে মেরে একবারে বেশি ডিম পাওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ একেবারে অন্ধকার। এই শিল্পে তখন ঝগড়া—বিবাদ—নৈরাজ্য ক্রমাগত বাড়তে থাকবে এবং আমরা একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলবো।
আমি প্রবন্ধের উপসংহারে এসে বলবো সকল প্রতিনিধির বক্তব্যগুলিতেই যিুক্ত রয়েছে। জাতীয় স্বার্থে সরকারের উচিত ন্যূনতম “কনসেনসাস” হিসাবে এগুলি গ্রহণ করা এবং আন্তরিকভাবে ও মালিক বা কায়েমী স্বার্থের পক্ষে এককভাবে না থেকে পক্ষপাত্বিহীনভাবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা। এজন্য শ্রমিকদেরও স্বীয় শ্রেণী স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট