চট্টগ্রাম বুধবার, ০৪ আগস্ট, ২০২১

সর্বশেষ:

২১ জুন, ২০২১ | ১:২০ অপরাহ্ণ

মিজানুর রহমান

চাটগাঁইয়া উদ্যোক্তার কাঁদতে কাঁদতে চট্টগ্রাম ছাড়ার গল্প

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এলাকা টঙ্গীর মাজুখান। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ সংলগ্ন এই এলাকার ৪৪ হাজার বর্গফুট জমিতে তৈরি ‘এক্সক্লুসিভ ক্যান লিমিটেড’ কারখানা। দেড়লাখ বর্গফুটের ৫ তলা এই কারখানার কাঁচের দেয়ালে বেশ বড় অক্ষরেই লেখা ‘প্রাউডলি চিটাগনিয়ান’। ঢাকার কারখানার কাচের দেয়ালের গায়ে এই ধরনের ‘অদ্ভুত’ লেখা কেনো? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ধারণাই সত্যি হলো। জানা গেলো- কারখানাটির মালিক চট্টগ্রামের ছেলে সৈয়দ নাসির।
চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠা নাসির নিজের মুখেই শোনালেন ‘অদ্ভুত’ এই লেখার কারণ। নাসির পূর্বকোণকে বলেন, চট্টগ্রামে জন্ম। চট্টগ্রামে বেড়ে উঠা। তাই চট্টগ্রামেই থাকতে চেয়েছি। ব্যবসাও শুরু করেছি চট্টগ্রামে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে দেশের পুরো ব্যবসা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার পর আমি ঢাকায় এসে দেখি- অনেকেরই বাড়ি চট্টগ্রাম এবং এই পরিচয় দিতে তারা সংকোচ বোধ করেন। চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে চান না। আমার মনে হয়-বাড়ি চট্টগ্রাম, চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলা, এটা গর্বের। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। ট্রেন ঢাকা থেকে টঙ্গী রেল স্টেশন পার হয়ে সামনে এগোতেই হাতের বাম পাশে আমাদের কারখানা। ঢাকায় ট্রেনে যাতায়াত করা চট্টগ্রামের সব মানুষ যেন দেখেন, ঢাকাতে একটি ‘মিনি চট্টগ্রাম’ আছে, আছে বুক উঁচু করা এক চাটগাঁইয়া ছেলে। এই ভাবনা থেকেই কারখানার কাচের দেয়ালে ‘প্রাউডলি চিটাগনিয়ান’ লেখা।
৩৯টি প্রতিষ্ঠানে নাসিরের পণ্য :
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে দুই হাজার বর্গফুটের একটি সেমিপাকা কারখানা দিয়ে ব্যবসা শুরু সৈয়দ নাসিরের। এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুটের তিনটি কারখানা তার। শুরুর দিকে কারখানায় রঙের কৌটা বা ক্যান তৈরির কাজ করতেন ২০ জন শ্রমিক। এখন এই কাজে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার খানেক লোকের। ধীরে ধীরে বেড়েছে তার ব্যবসার পরিধিও। ১ লাখ টাকা পুঁজির ব্যবসা এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকায়।
রং, আইসক্রিম, লুব্রিকেন্ট, ওষুধ এবং খাদ্যদ্রব্যের কৌটা তৈরি করে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে তার ৩টি কারখানা থেকে। রঙের কোম্পানি- বার্জার, এশিয়ান, নিপপন, ডুলাক্স, আইসক্রিম কোম্পানি- পোলার, সেভয়, কোয়ালিটি, লাভেলো, ওষুধ কোম্পানি- রেডিয়েন্ট, পপুলার থেকে শুরু করে দেশের জনপ্রিয় আড়ং, মিল্কভিটা, প্রাণ-আরএফএলসহ সব বড় বড় কোম্পানিতেই কৌটা সরবরাহ করেন নাসির। পণ্যের গুণগত মান অটুট রাখতে কারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে অর্ধশতাধিক রোবটসহ অত্যাধুনিক চীনা প্রযুক্তির মেশিনারিজ। কারখানার মোট জমির ৪০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি প্রোডাকশন ফ্লোরের মধ্যেও ৩৫ শতাংশ জায়গা মেশিনারিজ মুক্ত রাখা হয়েছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব করার জন্য।
শূন্য থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম বড় কৌটা কারখানার মালিক এখন নাসির। তবে এরপরেও খুশি নন চট্টগ্রামের এই উদ্যোক্তা। কেনো? এমন প্রশ্নের উত্তরে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেন তিনি। এক নাগাড়ে বলতে শুরু করেন ব্যবসা শুরুর কথা। চট্টগ্রাম ছেড়ে আসার কষ্ট। ঢাকায় ব্যবসা বড় করার সংগ্রাম থেকে শুরু করে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।
আই এম নট হ্যাপি:
নাসির জানান, ১৯৯৩ সালে বাবা এবং ভগ্নিপতির দেওয়া অল্প পুঁজি নিয়ে বার্জার পেইন্টসের ভেন্ডর হিসেবে ব্যবসা শুরু করি। চট্টগ্রামে বার্জারের রঙের কৌটা বানাতাম মুরাদপুরের কারখানায়। কিন্তু বিক্রয় ও বিপণনসহ নানা কারণে বার্জার তাদের হেড অফিস ও বিশালায়তনের কারখানা ঢাকায় স্থানান্তর করেন। এরপর ভারতের সবচেয়ে বড় রং প্রস্তুতকারী কোম্পানি এশিয়ান পেইন্টসও কারখানা নির্মাণ করে ঢাকাতেই। আস্তে আস্তে পেইন্টসের মার্কেটও ঢাকামুখী হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে আমি সাভারে একজন পার্টনার নিয়ে কারখানা শুরু করি। তবে পরিবার চট্টগ্রামেই রেখে যাই। ৩ বছর ব্যবসা করার পরও মন টিকেনি ঢাকাতে। ব্যবসা গুটিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসি। কিন্তু এশিয়ান পেইন্টস ব্যবসার জন্য বারবার অনুরোধ জানালে ২০০৬ সালে ফের ঢাকার টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠের পাশে ভাড়ায় ছোট একটি জায়গা নিয়ে কারখানা করি।
২০০৯ এর পর থেকে দেখি- দেশের জিডিপি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তখন টঙ্গী বিসিকে ১ বিঘার ১টি প্লট কিনে তাতে কারখানা তৈরি করি। ব্যবসা ক্রমান্বয়ে বাড়ার কারণে ২০১২ সালে সপরিবারে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকার উত্তরায় চলে আসি। গ্রীনলাইন পরিবহনের বাসে করে আসার পুরোটা সময় পুরো পরিবার কাঁদতে কাঁদতে আসি। এই ছেড়ে আসার স্মৃতি এখনো মনে পড়লে দু’চোখ জলে ভরে যায়। এখন ঢাকায় আমাদের সব হলেও চট্টগ্রামে থাকতে না পারার কষ্টে ‘স্টিল আই এম নট হ্যাপি’।
বাণিজ্যিক রাজধানী হয়নি চট্টগ্রাম :
নাসির বলেন, ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামকে প্ল্যান করে কমার্শিয়াল বেল্ট হিসেবে তৈরি করে তখনকার সরকার। ঢাকাসহ সারাদেশের অনেক ব্যবসায়ী এই কারণেই ব্যবসার জন্য চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ছুটে আসেন। ইস্পাহানীর মতো শিল্পগ্রুপ চট্টগ্রামে এসেছে ব্যবসার জন্য। এরপর ইউনিলিভার এসেছে। রেকিট বেনকিজার এসেছে। গ্লাক্সো, বার্জার পেইন্টস, সিঙ্গার, হোয়েস্টসহ নানা খাতের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এসেছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট, বায়েজিদ, নাসিরাবাদ, ফৌজদারহাট, সীতাকুণ্ড ছিলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আদর্শ জায়গা। কিন্তু ৯০ দশকের পর সরকারের ভুলনীতি ও চট্টগ্রামে যোগ্য নেতার অভাবে এই ধারা আমরা ধরে রাখতে পারিনি।
তিনি বলেন, দেশীয় পোশাক রপ্তানির যাত্রা শুরুই হয়েছে চট্টগ্রামের ‘দেশ গার্মেন্টস’ থেকে। দেশের প্রথম প্রাইভেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটির যাত্রা চট্টগ্রামেই। দেশের প্রথম এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন সিইপিজেডের কনসেপ্ট চট্টগ্রাম থেকেই শুরু। বন্দরের মতো কেপিআই এর কথা নাইবা বললাম। এতো সুবিধা থাকার পরেও চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। আমাদের ঢাকাকেন্দ্রিক আমলাদের অদূরদর্শিতা ও চট্টগ্রামে যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে বাণিজ্যিক রাজধানীর ধারণা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। এটা চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভাগ্য বলতে হবে।
দেশের কারখানাগুলো চট্টগ্রামে হলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমতো। কারণ কাঁচামাল আসে বন্দর দিয়ে। আর পণ্য রপ্তানি হয় বন্দর দিয়েই। এখন আমরা চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল এনে ঢাকার কারখানায় পণ্য তৈরি করছি। আবার এ সব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই রপ্তানি করছি। গাছের আগায় উঠে গাছ কাটছি নয় কি? এটা কিন্তু পুরোটাই ভুল পলিসি। অথচ আপনি ভারতের দিকে তাকান। সেখানে গুজরাট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটাল আর মুম্বাই বিজনেজ ক্যাপিটাল। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কোনো কারখানা নেই। সব কারখানা করাচিতে। একইভাবে জার্মানির বার্লিন বা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে কিন্তু কারখানা করতে দেয়া হয়নি। প্রায় প্রত্যেক দেশ রাজধানী এবং বাণিজ্যিক রাজধানী আলাদা করতে পেরেছে। রাজনৈতিক এবং আমলাতান্ত্রিক দূরদর্শিতার অভাবে আমাদের দেশে আমরা সেটা করে উঠতে পারিনি।
স্বপ্ন দেখাচ্ছে মেগা প্রজেক্ট :
নাসির বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় ইকোনমিক জোন হতে যাচ্ছে মিরসরাইয়ে। সাগরপাড়ের এই জোন বড় বড় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রচুর আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে। কর্ণফুলী টানেলের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামের বিশাল একটি অংশ আলো এবং উন্নয়নের মধ্যে ঢুকে পড়বে। একই সাথে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর আমাদের আমদানি রপ্তানি ব্যবসায় লিড টাইম এবং পরিবহন খরচ দুটোর ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। নিয়ে যাবে দেশকে একটি ভিন্নমাত্রায় বা উচ্চতায়।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু যেমন জিডিপিতে ১.৫ শতাংশ ভ্যালু এ্যাড করবে তেমনি গভীর সমুদ্রবন্দরও আমাদের জিডিপিতে ন্যূনতম ২ শতাংশ ভ্যালু এ্যাড করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারের এই উদ্যোগ চট্টগ্রামের মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়ে গেলে চট্টগ্রামকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য আবার ঘুরে দাঁড়াবে। ফলে আমার মতো ছোট, মাঝারি বা বড় কোন উদ্যোক্তাকেই আর ঢাকামুখী বা চট্টগ্রামের বাইরে গিয়ে কারখানা করতে হবে না। সারাপথে গ্রিনলাইনের বাসে বসে আর কাউকে কান্না করতে হবে না। এটাই হবে আমার মতো এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের কাঙ্ক্ষিত বা স্বপ্নের বিনিয়োগের তীর্থভূমি। সাগর, পাহাড়, নদী দিয়ে প্রকৃতি চট্টগ্রামকে এজন্যই সাজিয়েছে। এটা স্রষ্টারও চাওয়া বলে মনে হয় আমার কাছে।

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 2923 People

সম্পর্কিত পোস্ট