চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৩

১৫ জুন, ২০১৯ | ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

মিনারুল হক, বান্দরবান

নানা জাতের ফলের সমারোহ

বিষমুক্ত ফল কিনতে ক্রেতারা বান্দরবানে

মধুমাসে বাহারি ফলের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত এখন বান্দরবানের হাট-বাজারগুলো। আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস ও জামসহ নানা জাতের ফলের সমারোহ বাজারগুলোতে। ফরমালিনমুক্ত পাহাড়ের তরতাজা ফলগুলোর দিকে ক্রেতাদের নজরই বেশি। বান্দরবানে বেড়াতে আসা পর্যটকটরা কিনে নিচ্ছে সুবাসিত তাজা ফল। শুধু যে স্থানীয়ভাবে বিক্রি হচ্ছে তা নয়, এসব ফল ট্রাকে ট্রাকে করে প্রতিদিন যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের নানাস্থানে। দামে যেমন সস্তা তেমনি বিষমুক্ত। সেইসাথে পুষ্টিগুণ বেশি থাকায় বান্দরবানের পাহাড়ের এসব ফলের চাহিদা এখন দেশজুড়ে। ঢাকা, চট্টগ্রামের সুপার শপগুলোতে এখন বান্দরবানের আম লিচুসহ নানা জাতের ফল বেশ বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির সময়ে বিক্রেতারা ক্রেতাদের লোভ দেখাচ্ছেন এটি বান্দরবানের ফরমালিনমুক্ত তাজা ফল বলে। আবার অনেক ক্রেতা পাহাড়ের বাগান থেকেই ফল কিনে নিচ্ছেন বেশ কম দামে। কৃষি বিভাগের হিসেব মতে, গত দশ বছরে বান্দরবানে মিশ্র ফলের বাগান বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। বিশেষ করে জুমে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ায় জুমিয়ারা এখন বিকল্প চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর এতে মিশ্র ফলের বাগান করেই তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। বান্দরবানের চিম্বুক, লামার মিরিঞ্জা ও রুমা থানছির কেওক্রাডংয়ের পাহাড়গুলোতে অন্যান্য ফসলের সাথে সবচেয়ে বেশি ফল উৎপাদন হচ্ছে। চিম্বুক পাহাড় থেকে যে ফল উৎপাদন হয়, তা জেলার মোট ফল উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ। চিম্বুক পাহাড়ের গ্যস্বমনি পাড়ার মিশ্রফল চাষী লাল সাম বম। তার বাগানে এখন আম, আনারস, কাঁঠাল, লিচু, কলা ও পেপেসহ নানা জাতের ফল উৎপাদন হচ্ছে। ফল বিক্রি করে তিনি এখন স্বাবলম্বী। অথচ কয়েকবছর আগেও তিনি জুম চাষে তেমন লাভবান ছিলেন না। প্রথমে আনারস বাগান, পরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আম, লিচু, আনারস, কলা ও পেঁপেসহ বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে তোলেন লাল সাম। তার মতো চিম্বুক পাহাড়ের ফারুক পাড়া, লইমী পাড়া, বাগান পাড়া, পোড়া বাংলা, নতুন পাড়াসহ এমন কোন পাড়া নেই যেখানে মিশ্র ফলের বাগান করেনি চাষীরা। প্রতিদিনই ট্রাকে করে শত শত মেট্রিক টন আম, আনারস, কলা, পেঁপে ও লিচু চিম্বুক পাহাড় থেকে দেশের নানাপ্রান্তে চলে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলায় ৭০৬৬ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়েছে ৯৯৩৬৫ মেট্রিক টন। ৪৮৩২ হেক্টর জমিতে আনারস উৎপাদন হয়েছে ৮৬৪৮৯ মেট্রিক টন। লিচুর উৎপাদন হয়েছে ৫২২৮ মেট্রিক টন। ৩০৪০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল হয়েছে ৮৩৯৯৭ মেট্রিক টন। কলার উৎপাদন হয়েছে ২ লক্ষ ১২২২৪ মেট্রিক টন। পেঁপের উৎপাদন হয়েছে ১ লক্ষ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া অন্যান্য জাতের ফলের উৎপাদনতো রয়েছেই! জেলায় গত অর্থ বছরে মোট ৪৫৯৬৯ হেক্টর জমিতে ফলের উৎপাদন ছিল প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ মেট্রিক টন। প্রতি বছরই এই উৎপাদন বাড়ছে। জেলায় আমের বাগান বেশি হওয়ায় আম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। এখন পাহাড়ে ১০ জাতেরও বেশি আম পাওয়া যাচ্ছে। আগে যেখানে দেশি ও মায়ানমারের রাঙ্গুয়াই জাতের আম ছিল। এখন সেখানে আ¤্রপাালি, লক্ষণ ভোগ, হিম সাগর, লতা আম, মল্লিকা, বারোমাসি, গোপাল ভোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে রাঙ্গুয়াই ও আ¤্রপালি জাতের আমই বেশি উৎপাদন হচ্ছে পাহাড়ে।
বান্দরবান বাজারের ব্যবসায়ী নুর আহম্মদ জানান, বান্দরবানের পাহাড়ের ফলের দিকে ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। কারণ তরতাজা বিষমুক্ত, দেখতেও সুন্দর। সেইসাথে পুষ্টি বেশি। বিশেষ করে বেড়াতে আসা পর্যটকরা ফলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এই সময়ে পাহাড়ে বেশি ফল উৎপাদন হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা দেশের নানা জায়গায় চলে যাচ্ছে। বড় বড় ক্রেতারা আগাম বুকিং দিচ্ছেন ফলের জন্য। অপর বিক্রেতা সৈয়দ হোসেন জানান, বান্দরবান থেকে কলা, আনারস ও আম জেলার বাইরে বেশি যাচ্ছে। এসব ফলের উৎপাদনও দিন দিন বাড়ছে। এখন সরাসরি চিম্বুক পাহাড় থেকেই বাগান মালিকরা ফল বিক্রি করছে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে। বান্দরবান বাজারে ফল কিনতে আসা ঢাকার পর্যটক আমিনুল হক জানালেন, বান্দরবানের পাহাড়ের তরতাজা বিষমুক্ত ফলের কথা বহু শুনেছি। এখন নিজেই দেখে কিনতে আসলাম। চি¤ু^ক পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে তরতাজা ফল বিক্রি হওয়ায় এখন সেখান থেকেও কেনা যাচ্ছে। পাকা পেঁপে, রসালো আনারস, কাঁঠাল, নানা জাতের আম, কলা শোভা পাচ্ছে সেখানে। ব্যবসায়ীরা জানালেন, বান্দরবানে প্রথমদিকে আমের কেজি দেড়শ থেকে দুইশ টাকা হলেও এখন তা ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছে। রমযানের সময়ে দাম কিছুটা বেশি থাকলেও এখন কম দামেই তরতাজা ফল কিনতে পারবেন বাজারগুলো থেকে। পাহাড়ে একজোড়া বড় জাতের আনারস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাবে। কাঁঠালের দামও হাতের নাগালে। চাইলে বাগান থেকেই কিনতে পারবেন তরতাজা ফল। সেইসাথে পাহাড়ের ফলের সবুজ বাগানগুলোও দেখে নিতে পারবেন পরিবার পরিজনদের সাথে নিয়ে। মধুমাসের এই সময়ে পর্যটকরা মুগ্ধ হয়ে পাহাড় ঘোরে। বেড়ানোর পাশাপাশি তরতাজা বিষমুক্ত ফল কেনা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট