চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪

কই যাবেন, কয়টা লাগবে ?

আল-আমিন সিকদার

২৭ মে, ২০১৯ | ২:৩০ পূর্বাহ্ণ

বিকাল হওয়ার সাথে সাথে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে কমতে থাকে আগাম টিকিট প্রত্যাশীদের চাপ। তবে বাড়তে শুরু করে চলতি ট্রেনের টিকিট সংগ্রহকারীদের সংখ্যা। আর এই আগাম বা চলতি ট্রেনের টিকিট সংগ্রহে কেউ কাউন্টারে গিয়ে ব্যর্থ হলেও একটি চক্রের বদৌলতে থেমে থাকে না কারো যাত্রা। কেন না, সকল রুটেরই টিকিট মেলে এ কালোবাজারি চক্রের হাতে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও স্টেশনে যাত্রীদের কাছে গিয়ে গিয়ে টিকিট লাগবে কিনা জিজ্ঞাস করতে দেখা যায় এ চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে। তবে টিকিট বিক্রির উদ্দেশ্যে এ যাত্রী থেকে ও যাত্রীর পিছে ঘুরে বেড়ানো এ চক্রের সদস্যরা উপস্থিত যাত্রীদের নজর কাড়লেও তারা নজরে পড়েনি স্টেশনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাঁধে কিংবা হাতে ব্যাগ নিয়ে যাত্রীরা স্টেশনে প্রবেশ করা মাত্র তাদের কাছে গিয়ে গন্তব্য জানতে চাইছে এক ব্যক্তি। যাত্রীরা কেউ কেউ এই ব্যক্তিকে পাশ কাটিয়ে কাউন্টারে গেলেও কিছু যাত্রীকে কথা বলতে দেখা যায় তার সাথে। ব্যক্তিটির এ কর্মকা- বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ করেও তার সাথে কথা বলা বেশ কয়েকজন যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা যায় সে একজন টিকিট কালোবাজারি। এরপর যাত্রীবেশে টিকিট সংগ্রহের জন্য কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়ায় এপ্রতিবেদক। এরপর টিকিট কালোবাজারির সাথে জড়িত লোকটি লাইনের কাছে আসা মাত্র টিকিট না পাওয়ার আক্ষেপ করতে থাকে প্রতিবেদক। প্রতিবেদকের এই আক্ষেপ শুনে টিকিট কালোবাজারির সাথে জড়িত লোকটি জানতে চায় ‘কই যাবেন’?। প্রতিবেদক তার প্রশ্নের উত্তরে জানান, ৩ জুনের চাঁদপুরগামী মেঘনা ট্রেনের আগাম টিকিট লাগবে। কিন্তু কাউন্টার বলছে টিকিট শেষ। লোকটি তখন বলেন, কয়টা টিকিট লাগবে? টিকিট আছে কিন্তু দাম একটু বেশি পড়বে। প্রতি টিকিট ৫০০ টাকা করে দিতে হবে। প্রতিবেদক তখন ৪টি টিকিট লাগবে জানিয়ে লোকটির নাম ও মোবাইল নম্বর জানতে চায়। এবং বলে, টাকা বিকাশে আনার পর টিকিট নিবে; তাই মোবাইল নম্বর দরকার। এতে কালোবাজারি লোকটি প্রতিবেদককে পুলিশ ও গোয়ান্দা সংস্থার সোর্স কিংবা সদস্য মনে করে সন্দেহ করেন। এবং তার কাছে কোন টিকিট নেই বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেসের ৪ জুনের জন্য আগাম টিকিট নিতে আসা শাহাদাত নামে এক ব্যক্তির সাথেও কথা বলতে দেখা যায় টিকিট কালোবাজারির সাথে জড়িত একই ব্যক্তিকে। এ সময় শাহাদাতের কাছে
। ৯ম পৃষ্ঠার ৩য় ক.­

টিকিট কালোবাজারির সাথে জড়িত ব্যক্তির কি কথোপকথন হয়েছে তা জানতে চায় প্রতিবেদক। শাহাদাত বলেন, দুপুর হতে না হতেই শেষ হয়ে যায় ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেসের ৪ জুনের জন্য দেয়া আগাম টিকিট। তবে টিকিট শেষ হয়ে গেলেও আমি স্টেশন ছাড়িনি। কারণ, আমি জানি ‘ভাত ছিটাইলে কাউয়ার অভাব হয় না’। তাই স্টেশনে টিকিটের জন্য ঘুরতে থাকলাম। আর এ সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকজন টিকিট কালোবাজারি এসে জানিয়েছে তাদের কাছে টিকিট আছে। কিন্তু দাম বেশি চাওয়াতে এখনো টিকিট নেইনি। আপনি যে ব্যক্তিটির কথা বলছেন, সেও জানালো ময়মনসিংহের টিকিট আছে কিন্তু প্রতি টিকিটের মূল্য চাইছে কাউন্টারের থেকে তিনগুণ বেশি। তিনি আরো বলেন, ময়মনসিংহগামী শোভন চেয়ারের টিকিটের মূল্য ৩৮৫ টাকা। অথচ সে (কালোবাজারি) চাইছে প্রতি টিকিট ৮০০ টাকা। এরআগে অনেকজনতো এক হাজার টাকাও চেয়েছে। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখি দাম কমে কি না’। আর টিকিট না পেলে এভাবে যে টিকিট সংগ্রহ করা যায় এই অভিজ্ঞতা যারা ট্রেনে ভ্রমণ করে তাদের সবারই আছে বলে জানান তিনি’।
তবে স্টেশন জুড়ে টিকিট কালোবাজারিদের এই রমরমা টিকিট বাণিজ্য যারা করছে তারা স্টেশনের বা রেলওয়ের সাথে জড়িত কেউ নয় বলে জানিয়েছেন স্টেশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, আপনি যে কালোবাজারিদের কথা বলছেন তারা কিভাবে এ টিকিট সংগ্রহ করছে জানি না। তবে স্টেশন বা কাউন্টারের কেউ যে এ কর্মকা-ের সাথে জড়িত নয় তার শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, যারা এ কালোবাজারি করছে তারা কাউন্টার থেকে নয়, টিকিটগুলো সংগ্রহ করছে অনলাইনের মাধ্যমে। এবং কাউন্টার থেকে এ টিকিটগুলো সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে যাত্রীদের কাছে। আর এসব কালোবাজারিদের গ্রেপ্তার করারও নির্দেশ দেয়া রয়েছে স্টেশনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রেলওয়ে পুলিশসহ সকল সদস্যদের’।
এদিকে স্টেশন ম্যানেজারের দেয়া কালোবাজারিদের টিকিট সংগ্রহের এ তথ্যটির প্রমাণ পাওয়া যায় গত বৃহস্পতিবার (২৪ মে) নগরীর কোতোয়ালীতে ৬১ আসনের ৫০টি রেলের আগাম টিকিট নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া মো. রুস্তম আলী প্রকাশ জাহাঙ্গীর আলমের (৪৭) দেয়া জবানবন্দিতে। নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এস আই) ইমাম হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, ‘৬১ আসনের ৫০টি রেলের আগাম টিকিট নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় জাহাঙ্গীরকে। এ সময় টিকিট সংগ্রহের বিষয়ে গ্রেপ্তার হওয়া জাহাঙ্গীরের কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, অনলাইনে টিকিট ছাড়ার সাথে সাথে টিকিট ক্রয় করা শুরু করেন তারা। যেহেতু অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করতে এনআইডি কার্ডের প্রয়োজন হয়, তাই তারা একটি গ্রুপ তৈরি করে। আর এই গ্রুপের সকল সদস্যরা তাদের এনআইডি দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে। অনলাইন টিকিট সংগ্রহের পর তারা ভোর হতে না হতে চলে আসে কাউন্টার থেকে টিকিট নেয়ার জন্য। আর টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিক্রি করা পর্যন্ত তাদের প্রতিটি সদস্য একসাথে কাজ করে। এবং বিক্রি শেষে টাকা ভাগ করে নেয়। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে টিকিট কালোবাজারির দায়ে আগেও দুটি মামলা রয়েছে বলে জানান গোয়ান্দা পুলিশের এ কর্মকর্তা।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে গত ২২ তারিখ থেকে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি করছে রেল কর্তৃপক্ষ। গতকাল শেষ দিনের মত আগাম টিকিট বিক্রি শেষ হয়। শেষ দিনে গত দিনগুলোর মত ময়মনসিংহগামী বিজয় ট্রেন ও চাঁদপুরগামী মেঘনা ট্রেনের টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে গেলেও অবিক্রিত থেকে যায় প্রায় চারশত টিকেট। যার মধ্যে ঢাকাগামী সোনার বাংলা ট্রেনের ২৫০টি, তূর্ণা নিশিতার ৪০টি ও সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ৭০টি টিকিট থেকে যায় অবিক্রিত। অন্যদিকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ৪ জুন ছেড়ে যাবে দুটি স্পেশাল ট্রেন। যেখানে ৬০০টি টিকিট থাকবে বলে জানান স্টেশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ। অবিক্রিত এসব টিকিটগুলো যেকোন সময় কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করা যাবে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট