
দুই সপ্তাহের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। এখন আর এটি ‘যুদ্ধবিরতি’ নয়, বরং স্পষ্টতই ‘যুদ্ধের বিরতি’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ব্যর্থতা নতুন এক বিপজ্জনক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। যেখানে সংঘাত থেমে নেই বরং নতুন রূপে বিস্তৃত হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। ইরান আগে থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল সীমিত করে কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই প্রণালিতে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও।
এই অবরোধের লক্ষ্য হলো ইরানকে তার ‘তেল-নিয়ন্ত্রণ কৌশল’ থেকে বঞ্চিত করা এবং তাকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করা। কিন্তু বাস্তবে এটি এক বিপজ্জনক দ্বৈত অবরোধে রূপ নিয়েছে। একদিকে ইরানের আংশিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ। ফলে হরমুজ এখন আর শুধু একটি সামুদ্রিক রুট নয় বরং এটি হয়ে উঠেছে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
ইরানের প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই অবরোধকে তারা ‘যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য’ হিসেবে দেখবে এবং প্রয়োজনে উপসাগরীয় বন্দরগুলোতেও পাল্টা আঘাত হানতে পারে।
অর্থাৎ, সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপই সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অবস্থান আরও আক্রমণাত্মক। আলোচনার ব্যর্থতার পর শুধু অবরোধ নয়, বরং ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি এই সংকটকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ হিসেবেও দেখছেন, যা এই সংঘাতকে কৌশলগতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায়ও রূপ দিচ্ছে।
এদিকে, সংঘাতের আরেকটি বিপজ্জনক মাত্রা হলো ইসরায়েল-লেবানন ফ্রন্ট। ইসরায়েল ইতোমধ্যেই লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এই সংঘাত এখন আর পার্শ্ববর্তী নয়; বরং এটি পুরো যুদ্ধের একটি সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন বাস্তবতায় তিনটি স্তরে বিস্তৃত। সেগুলো হলো-সরাসরি সামরিক ও নৌ শক্তির প্রদর্শন, হরমুজকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং লেবাননসহ প্রক্সি ফ্রন্টে আঞ্চলিক সংঘাত। এই পরিস্থিতিতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ অবিলম্বে শুরু না হলেও ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষত, হরমুজে যেকোনো সামরিক সংঘর্ষ সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে বিপর্যস্ত করবে। যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে।
বর্তমান বাস্তবতা থেকে তিনটি সম্ভাব্য পথ এখন স্পষ্ট। এগুলো হলো- একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় অবরোধ ও সীমিত সংঘাত চলতেই থাকবে, হরমুজ বা লেবাননকে কেন্দ্র করে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধ চলবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতুন করে আলোচনার সূচনা। যদিও এই সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, এই সংঘাত আর কেবল ‘যুদ্ধ’ নয়। এটি এখন একটি বহুস্তরীয় ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষ, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত মাত্রা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
প্রশ্ন এখন আর ‘যুদ্ধ হবে কি না’ তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো- এই সংঘাত কোন্ মুহূর্তে, কোন্ ফ্রন্টে এবং কত দ্রুত বিস্ফোরিত হবে?