চট্টগ্রাম বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

সম্ভাবনার পাশাপাশি অদৃশ্য ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র (এআই) বিস্তার এক নতুন যুগের সূচনা করেছে— যেখানে প্রযুক্তি যেমন উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করছে, তেমনি অদৃশ্যভাবে তৈরি করছে বহুমাত্রিক ঝুঁকি। আজ এআই কেবল গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি এখন সাধারণ মানুষের হাতে, মোবাইল ফোনে, সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। এই সহজলভ্যতা যেমন ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে সমাজের বিভিন্ন খাতে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

 

প্রথমেই শিক্ষা খাতের দিকে তাকানো যাক। শিক্ষার্থীরা এখন সহজেই এআই ব্যবহার করে প্রবন্ধ, এসাইনমেন্ট, এমনকি গবেষণাপত্র তৈরি করছে। এতে তাৎক্ষণিক সুবিধা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষকরা অনেক সময় বুঝতেই পারছেন না কোন কাজটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব এবং কোনটি এআই-নির্ভর। ফলে শিক্ষার মান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। উদাহরণস্বরুপ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে এআই-নির্ভর নকলের অভিযোগ উঠেছে, যা ভবিষ্যতের মানবসম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

 

মিডিয়া ও তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কনটেন্ট তৈরি প্রযুক্তি এখন এতটাই উন্নত যে মিথ্যা খবর, ভুয়া ছবি এবং ডিপফেক ভিডিও তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমত প্রভাবিত করে। নির্বাচনকালীন সময়ে বা রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রযুক্তি ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের ভুয়া বক্তব্য প্রচারের ঘটনা ঘটেছে— বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

 

আর্থিক খাতেও এআই নির্ভর প্রতারণার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। ফিশিং, ভুয়া কল, পরিচয় চুরি— সবকিছু এখন আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে করা সম্ভব হচ্ছে এআই’র মাধ্যমে। আমরা ভুলে যেতে পারি না বাংলাদেশ ব্যাংক সাইবার ডাকাতির ঘটনা, যেখানে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি ডলার চুরি করা হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় এআই এই ধরনের অপরাধকে আরও জটিল ও শনাক্ত-অযোগ্য করে তুলতে পারে। ফলে ব্যাংকিং ও আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

 

প্রশাসনিক ও শাসন ব্যবস্থায়ও এআই’র ব্যবহার দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে এটি সেবার গতি ও দক্ষতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে ভুল তথ্য, পক্ষপাতদুষ্ট এলগরিদম বা ডেটা বিকৃতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে এটি জনআস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছু দেশে ইতোমধ্যে এআই ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এআই ব্যবহারে সচেতনতার অভাব। সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারছেন না কোন তথ্যটি সত্য, কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতারণা, সামাজিক বিভ্রান্তি এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঘটনা বাড়ছে| এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রথমত, একটি সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। এতে প্রযুক্তির ব্যবহার, নৈতিকতা, গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই সচেতনতা ও নৈতিক ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে, বিকল্প হিসেবে নয়।

 

তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ এআই ভিত্তিক অপরাধ সীমান্ত মানে না।

 

সবশেষে, গণসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এআই’র সুবিধা যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে ভালো বা খারাপ নয়, এটি নির্ভর করে এর ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশে এআই’র দ্রুত বিস্তার যদি সঠিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় না আনা যায়, তবে এটি উন্নয়নের সহায়ক না হয়ে বরং একটি নীরব সংকটে পরিণত হতে পারে। এখনই সময়—  সতর্ক হওয়ার, প্রস্তুত হওয়ার, এবং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণের জন্য সঠিক পথে পরিচালিত করার।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট