
ফটিকছড়ি থেকে আসা মরিয়ম বেগম সকাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ঘুরছেন। ছেলের জ্বর থামছে না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফেরার পথেই কথা হয় তার সঙ্গে। এত দূর পাড়ি দিয়ে কেন এলেন শহরে? জানতে চাইলে মরিয়ম বেগম বলেন, এই শহরে চিকিৎসার ভরসা বলতে চমেক হাসপাতাল।
জানা যায়, হাসপাতালেই প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার মানুষ আসেন চিকিৎসা নিতে। জরুরি বিভাগ থেকে বহির্বিভাগ-সব জায়গায় রোগীর ভিড়। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও টেকনাফ থেকে কুমিল্লা-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর থেকে ছুটে আসেন রোগীরা। বর্তমানে হাসপাতালের শয্যা ২২০০, কিন্তু ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করছে। এই চাপ শুধু সাধারণ রোগী নয়, হৃদরোগ, কিডনি, নিউরোলজি,বার্ন, ক্যান্সার ও শিশু রোগ-সবক্ষেত্রেই পড়ছে।
তথ্য অনুসারে, চমেক হাসপাতাল ১৯৫৭ সালে মাত্র ১২০ শয্যা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে শয্যা বৃদ্ধি পায়। এরমধ্যে ১৯৬৯ সালে ৫০০ শয্যা, ১৯৯৬ সালে ৭৫০ শয্যা, ২০০১ সালে ১০১০ শয্যা এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালে ১৩১৩ শয্যায় উন্নীত হয়। এরপর সর্বশেষ ২০২২ সালে শয্যা বেড়েছে ২২০০ পর্যন্ত। কিন্তু জনবল এখনও ৫০০ শয্যার সমান। প্রতিনিয়ত ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, আয়া ও ওয়ার্ড বয়ের সংকট দেখা দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলেন, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল চমেকের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে হাসপাতালটি অদূরে থাকা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, বিআইটিআইডি হাসপাতাল, বন্দর হাসপাতালসহ সরকারি একাধিক হাসপাতাল থাকলেও রোগীরা সেখানে যায় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেও কম জটিল রোগীদের রেফার করা হয় চমেক হাসপাতালে। যার কারণে রোগীর ভারে সেবাদানেও হিমশিম খেতে হয়।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বললেন, এমন কোনো রোগী নেই, যারা চিকিৎসার জন্য এখানে ছুটে আসে না। শিশু, ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা বিস্ফোরণ ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়। বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলে এই চাপ অনেকটা কমে যেত। জনবল ও বাজেট সমস্যা রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে। আমাদের নার্স ও সাপোর্ট স্টাফের সংখ্যা আরও প্রয়োজন।
এদিকে, চমেক হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে বহুবার একাধিক নতুন হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগসহ নানান উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এসব উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে-কলমে থাকলেও, বাস্তবায়ন এখনও অনিশ্চিত। যদিও নতুন করে চীন সরকারের অর্থায়নে চমেক হাসপাতালে অধীনেই নতুন একটি বার্ন ইউনিট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে এখনোও অনেক পিছিয়ে আছে-এমন মত স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম। অথচ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় এখনও অনেকটাই পিছিয়ে।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো ও জনবল সংকটের কারণে দিন দিন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। হৃদরোগ, কিডনি, নিউরো, বার্ন, শিশু ও মানসিক রোগের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য এখানে নেই বিশেষায়িত হাসপাতাল। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। এতে বাড়তি সময়, অর্থ ও ভোগান্তি তো আছেই, অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর সুযোগও নষ্ট হচ্ছে।
পূর্বকোণ /ইবনুর