
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদসহ অনেকের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ দিয়েছেন মো. মশিউর রহমান (মামুন) নামের বরগুনার সাবেক এক যুবদল নেতা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এই অভিযোগ দেন মশিউর রহমান।
তার অভিযোগ, ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে তুলে নিয়ে ছয় মাস আটকে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
মামুন সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ব্যাংকক যাওয়ার পথে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর টানা ছয় মাস তাকে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে একটি গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়।
তিনি বলেন, “গুম অবস্থায় আমাকে টানা ছয় মাস অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমি আগে প্রতিদিন পাঁচ মাইল দৌড়াতাম, খেলাধুলা করতাম। আর এখন আমি ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না, অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি।”
টানা ছয় মাস গুম রাখার পর ২০১৫ সালের ২৩ অগাস্ট তাকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে ভাষ্য মামুনের। এরপর তাকে আদালতে উপস্থাপন করে রিমান্ড আবেদন করা হয়। দুই দফা রিমান্ড শেষে তাকে প্রায় দুই বছর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বাধীন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন জানিয়ে মামুন বলেন, ছাত্রদল থেকে শুরু করে যুবদল ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
শেখ হাসিনা ও তার প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “যাদের নির্দেশে গুম ও খুন হয়েছে, আমাকেও সেই নির্দেশেই গুম করা হয়েছে।”
তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তিনি অভিযোগ তোলা অন্য কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন মামুন।
তিনি বলেন, “অনেকে ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, নাম প্রকাশ করলে অন্যরাও পালিয়ে যেতে পারে।”
গুম ও নির্যাতনের শিকার মামুন বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনেই তাকে সেখানে থাকতে হচ্ছে। তার ওপর চালানো নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল।
পূর্ব লন্ডনে বসবাসরত মামুনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গুম থাকা অবস্থায় তাকে কয়েকদিন চোখ বেঁধে রাখা হয়, হাত বেঁধে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়, বারবার মারধর করা হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ছয় মাস ধরে কোনো কথা না বলে তার সারা শরীরে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছিল। ওই সময় তার কেবলই মনে হতো, তার ছেলে-মেয়ে বা স্ত্রী কখনও জানতেও পারবে না যে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
শারীরিক ও মানসিক এই নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ছাড়তে পারেননি। পরবর্তীতে তার স্ত্রী যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনে সফল হলে তিনি লন্ডনে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন।
মামুনের ওপর চালানো নির্যাতনের মানসিক ও শারীরিক প্রভাবের বিবরণ যুক্তরাজ্যের স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ট্রাস্টের নথিতে সংরক্ষিত আছে বলে বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। দেশে ফিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই নির্মমতারই সুবিচার চেয়েছেন তিনি।
পূর্বকোণ/পিআর