
বাংলাদেশে ২০২৪-২৫ সময়ে হাম (measles) টিকাদানে যে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়-এটি একটি নীরব কিন্তু গভীর জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে একাধিক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: এই দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া সংকট সম্পর্কে কেন আমরা সময়মতো সতর্ক হইনি?
বাংলাদেশ অতীতে দেখেছে, একজন চিকিৎসকের সতর্কতা কীভাবে একটি জাতীয় সংকটকে উন্মোচিত করতে পারে। দূষিত প্যারাসিটামল সিরাপের ঘটনায় Dr. Shafiqul Islam Khan অস্বাভাবিক শিশুমৃত্যুর ধারা শনাক্ত করে সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর সেই উদ্যোগ কেবল একটি কারণ উদ্ঘাটন করেনি, বরং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল এবং ওষুধ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এনেছিল।
আজকের প্রেক্ষাপটে সেই ইতিহাস আমাদের সামনে এক নির্মম তুলনা তুলে ধরে-তখন একজন চিকিৎসক কথা বলেছিলেন, আজ অনেকেই নীরব। পেশাজীবীদের নীরবতার কারণে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-এটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, missed cohort, coverage gap-এসব একদিনে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, এবং সেই সময়টাতেই প্রয়োজন ছিল সতর্কতা, বিশ্লেষণ ও জনসচেতনতা। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনের প্রথম সাক্ষী ছিলেন। তারা প্রতিদিন দেখেছেন টিকা না পাওয়া শিশু, হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগী এবং প্রতিরোধযোগ্য জটিলতা। তবুও জাতীয় পর্যায়ে একটি সংগঠিত সতর্কবার্তা আমরা পাইনি। পেশাজীবী সংগঠনগুলো যেমন-Bangladesh Paediatric Association -এই সংকটে একটি শক্ত অবস্থান নিতে পারত, যা জনমত ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারত। কিন্তু তাদের ভূমিকা ছিল সীমিত, অনেক ক্ষেত্রে নীরব।
এই সংকটে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তারাই surveillance data বিশ্লেষণ করেন, trend I outbreak risk আগেভাগে শনাক্ত করেন, risk communication এবং policy advocacy পরিচালনা করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে হামের টিকাদান কভারেজের গ্যাপ নিয়ে কোনো শক্তিশালী জনসতর্কতা ছিল না, mass awareness campaign বা মিডিয়া সম্পৃক্ততা সীমিত ছিল এবং জনগণ বা অভিভাবকদের জন্য পরিষ্কার কোন বার্তা দেওয়া হয়নি। ফলে একটি ‘silent gap’ তৈরি হয়েছে-যেখানে তথ্য ছিল, কিন্তু সেই তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশের Expanded Programme on Immunization (EPI) দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত ডাটা সংগ্রহ, কভারেজ রিপোর্টিং-সবই ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ডাটাগুলো কি যথাযথভাবে বিশ্লেষিত হয়নি? নাকি বিশ্লেষণ হলেও তা অ্যাকশনে রূপ নেয়নি?এই জায়গাতেই দেখা যায় একটি বড় দুর্বলতা-data-to-action gap. অর্থাৎ, তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা সময়মতো সতর্কতা, নীতিগত পরিবর্তন বা জনসচেতনতায় রূপান্তরিত হয়নি।
এই সংকটকে একক কোনো পক্ষের উপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা আড়াল করা হবে। আমার মনে হয় এটি একটি সমষ্টিগত ব্যর্থতা। বিশেষ করে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসন কর্তৃক পরিকল্পনা, ফান্ডিং এর বাস্তবায়নে ঘাটতি বাস্তবায়নকারী সংস্থা (EPI) এর সাপ্লাই ও মাঠপর্যায়েরও সীমাবদ্ধতা। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে সংকেত থাকা সত্ত্বেও সংগঠিত কণ্ঠের অভাব ছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি যোগাযোগ ও অ্যাডভোকেসিতে দুর্বলতা- মোট কথা এই চারটি স্তর মিলেই একটি ‘system-wide silence’ তৈরি করেছে-যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিশুদের উপর।
চিকিৎসকদের দায়িত্ব কেবল প্রেসক্রিপশন লেখা নয়। তারা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর-শিশুদের-পক্ষে কথা বলার নৈতিক দায়িত্ব বহন করেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের কাজ কেবল ডাটা বিশ্লেষণ নয়-বরং সেই ডাটাকে জনগণের সুরক্ষায় ব্যবহার করা। এই প্রেক্ষাপটে নীরবতা কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়; এটি একধরনের ব্যর্থতা-কখনো কখনো তা বিপজ্জনকও। ভবিষ্যতের জন্য এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই কিছু পদক্ষেপ জরুরি বলে আমি মনে করি। যেমন শক্তিশালী early warning system গড়ে তোলা, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সক্রিয় জনস্বাস্থ্য ভূমিকা নিশ্চিত করা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মিডিয়া ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা। এছাড়াও surveillance data দ্রুত public alart-এ রূপান্তর করা এবং টিকাদান কর্মসূচিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখা বাংলাদেশে হাম টিকার গ্যাপ আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে কারন সংকট সবসময় হঠাৎ আসে না; অনেক সময় তা নীরবতার ভেতরেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
যখন কথা বলার সময় ছিল, তখন যদি যথেষ্ট কণ্ঠ না ওঠে, তাহলে তার মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে অসহায়দের- আমাদের শিশুদের। শেষপর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়, আমরা কি ভবিষ্যতে এই নীরবতা ভাঙতে পারব? নাকি আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে?
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর