চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা কেমন হওয়া উচিত

অসম যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৫ এপ্রিল, ২০২৬ | ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক অসম যুদ্ধের যুগে যুদ্ধক্ষেত্র আর কেবল সীমান্ত, আকাশ বা সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন অদৃশ্য এক ডিজিটাল পরিসরে বিস্তৃত। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের পারস্পরিক উত্তেজনা দেখিয়েছে সাইবার আক্রমণ কখনো কখনো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক কিংবা জনমত—সবই এখন লক্ষ্যবস্তু। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সাইবার নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

 

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের নিজস্ব একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করা জরুরি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ একাউন্টে সংঘটিত সাইবার জালিয়াতি—যেখানে প্রায় ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়ে ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা ছিল। এটি কেবল একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়; বরং রাষ্ট্রের সাইবার দুর্বলতার এক নগ্ন প্রকাশ, যা দেখিয়ে দিয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষিত না হলে জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

 

প্রথমত, বাংলাদেশকে সাইবার নিরাপত্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেমন স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী রয়েছে, তেমনি সাইবার ক্ষেত্রকেও একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতি— এসব খাত সাইবার আক্রমণের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম কয়েক ঘণ্টার জন্য ব্যাহত হলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী।

 

দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত ‘সাইবার কমান্ড’ গঠন অপরিহার্য। এতে সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বেসামরিক আইটি বিশেষজ্ঞদের এক ছাতার নিচে আনা উচিত। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত কমান্ড কাঠামো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়াকে নিশ্চিত করবে।

 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেস, ভূমি রেকর্ড—এসব ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাটি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, একটি মাত্র দুর্বলতা কীভাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল ক্ষতির কারণ হতে পারে।

 

তবে কেবল প্রতিরক্ষা যথেষ্ট নয়। সীমিত পরিসরে হলেও আক্রমণাত্মক সাইবার সক্ষমতা গড়ে তোলা দরকার, যা প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে। শত্রুপক্ষের প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা, তাৎক্ষণিক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কৌশলগত বার্তা দেওয়ার জন্য এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। অসম যুদ্ধে ছোট রাষ্ট্রও সাইবার মাধ্যমে বড় শক্তিকে চাপে ফেলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। সাইবার যুদ্ধের মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং নৈতিক হ্যাকারদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি দক্ষ ‘সাইবার রিজার্ভ ফোর্স’ গঠন করা যেতে পারে। সংকটকালে এই বাহিনী রাষ্ট্রকে সহায়তা করবে।
একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য। দেশের টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং ও ই-কমার্স খাতের বড় অংশই বেসরকারি বা আংশিক বেসরকারি। তাই একটি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মানদণ্ড, তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

আধুনিক সাইবার যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বা ডিসইনফরমেশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত করা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা বা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন সহজতর হয়েছে। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ, তবে নির্ভরশীলতা নয়। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো দরকার, কিন্তু কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো প্রয়োজন, যাতে সাইবার অপরাধ দমন, তথ্য সুরক্ষা এবং সাইবার যুদ্ধে নীতিমালা সুস্পষ্ট থাকে।

 

সবশেষে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ‘পরকুপাইন স্ট্র্যাটেজি’ —অর্থাৎ এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সহজে ভেদ করা যায় না এবং আক্রমণকারীকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য করে। শক্তির প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বুদ্ধিমত্তা, স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখাই হবে সঠিক পথ।
ডিজিটাল যুগের এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ী হবে সেই রাষ্ট্র, যারা আগেভাগে প্রস্তুতি নেবে। বাংলাদেশের সামনে এখনই সেই প্রস্তুতি নেওয়ার সময়।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট