চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬

বইয়ে উদ্ভাসিত হোক শিশুদের মনোজগৎ

আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস

বইয়ে উদ্ভাসিত হোক শিশুদের মনোজগৎ

উত্তম কুমার আচার্য

৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

শিশুরা মানবসমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। তাদের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব শিশুগ্রন্থ দিবস’। বিশ্ব শিশুগ্রন্থ দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করা। এ দিবস শিশুদের কল্পনা, চিন্তাশক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে বইয়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি এটি শিশুদের জন্য মানসম্মত সাহিত্য রচনায় লেখক, প্রকাশক ও অভিভাবকদের উৎসাহিত করে।

 

ডেনমার্কের বিশ্ববিখ্যাত রূপকথার জাদুকর হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের জন্মদিন হচ্ছে ২ এপ্রিল। এই দিনটিকে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস হিসেবে। ইউনেস্কোর আওতায় ‘ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অন বুকস ফর ইয়াং পিপল’ (ইবিবিওয়াই)-এর উদ্যোগে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ইবিবিওয়াই-এর কাজ হচ্ছে শিশুদের বই লেখা, ছবি আঁকা, বই প্রকাশ করা এবং ছোটদের শিক্ষাদানে যারা সম্পৃক্ত তাদের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করা। একই সঙ্গে ভালো বইয়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬৮টি দেশ এর সদস্য—বাংলাদেশেও এর দুজন ব্যক্তিগত সদস্য রয়েছেন। বিশ্বব্যাপী এরূপ যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে শিশুদের জন্য মানসম্পন্ন গ্রন্থ প্রকাশই ইবিবিওয়াই-এর মূল কাজ।

 

ইবিবিওয়াই-এর অন্যান্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. একটি ত্রৈমাসিক ‘বুক বার্ড’ (উৎস অনুযায়ী বুক কার্ড) প্রকাশ, ২. শিশুসাহিত্যের জন্য হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাওয়ার্ড প্রদান, ৩. পাঠপ্রবণতা প্রসারের জন্য পুরস্কার প্রদান, ৪. ছোটদের প্রকাশনা বিষয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার আয়োজন করা এবং ৫. আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস পালন।

 

প্রতিবছর ইবিবিওয়াই একটি দেশকে মুখ্য দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সে দেশের একজন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিককে গ্রন্থ দিবসের বাণী প্রদানের জন্য আহ্বান জানায়। ২০০২ সালে মুখ্য দেশ ছিল অস্ট্রিয়া, ২০০৩ সালে ব্রাজিল এবং ২০০৪ সালে গ্রিস। ২০০৪ সালে বাণী প্রদান করেছিলেন গ্রিসের লেখক আনজেলিকি জারেলা। ২০০৫ সালে মুখ্য দেশ ছিল ভারত। ২০০৬-এর মুখ্য দেশ ছিল স্লোভেনিয়া; প্রতিপাদ্য ছিল ‘বই পরিবর্তন আনে’। ২০০৭ সালে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা; প্রতিপাদ্য ছিল ‘পাঠই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি’। ২০০৮ সালে ছিল থাইল্যান্ড; প্রতিপাদ্য ছিল ‘বই সুযোগ সৃষ্টি করে’। ২০০৯ সালে মুখ্য দেশ ছিল মিশর আর প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমিই বিশ্ব, বিশ্ব আমার’। ২০১০ সালে মুখ্য দেশ ছিল স্পেন আর প্রতিপাদ্য ছিল ‘একটি বই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে’। ২০১১ সালের দেশ ছিল এস্তোনিয়া; প্রতিপাদ্য ছিল ‘বই হলো স্মৃতির ধারক’। ২০১২ সালের দেশ ছিল মেক্সিকো, থিম ছিল ‘এক ছিল গল্প’। ২০১৩ সালের মুখ্য দেশ ছিল আমেরিকা আর থিম ছিল ‘বিশ্বজুড়ে বইয়ের আনন্দ’। ২০১৪ সালের দেশ ছিল আয়ারল্যান্ড ও প্রতিপাদ্য ছিল ‘গল্পে জাতির কল্পনা’। ২০১৫ সালের স্পন্সর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত আর থিম ছিল ‘বহু সংস্কৃতি, এক গল্প’।২০১৬ সালের স্পন্সর ছিল ব্রাজিল আর থিম ছিল ‘এক ছিল গল্প’। ২০১৭-তে রাশিয়া স্পন্সর করে ‘চলো, বইয়ের সাথে বড় হই’ এই প্রতিপাদ্যে। ২০১৮ সালের স্পন্সর ছিল লাটভিয়া; থিম: ‘ছোট জিনিসও বইয়ে বড়’। ২০১৯-এর স্পন্সর ছিল লিথুয়ানিয়া; থিম: ‘বই আমাদের ধীরস্থির হতে শেখায়’। ২০২০-এর মুখ্য দেশ ছিল স্লোভেনিয়া; থিম: ‘শব্দের জন্য ক্ষুধা’। ২০২১ সালে আমেরিকা পুনরায় মুখ্য দেশের ভূমিকা পালন করে; থিম ছিল ‘শব্দের সুরমাধুরী’। ২০২২ সালে স্পন্সর হয় কানাডা; থিম: ‘গল্প ডানা দেয় উড়তে’। ২০২৩ সালের স্পন্সর দেশ ছিল গ্রিস; থিম বা প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমি বই, আমাকে পড়ো’। ২০২৪ সালের মুখ্য দেশ ছিল জাপান; থিম ছিল ‘কল্পনার ডানায় সমুদ্র পাড়ি’। ২০২৫ সালের মুখ্য দেশ হিসেবে দিবসটিকে স্পন্সর করে নেদারল্যান্ডস; থিম: ‘পাঠ ও কল্পনার বিস্তার’। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস স্পন্সর করছে চেক রিপাবলিক।

 

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের প্রভাব বাড়ছে, ফলে বই পড়ার আগ্রহ অনেকটা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব শিশুগ্রন্থ দিবস নতুন করে বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের উচিত শিশুদের হাতে মানসম্মত বই তুলে দেওয়া এবং তাদের পড়ার পরিবেশ তৈরি করা। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস এখনো প্রত্যাশিতভাবে পালিত হয়নি। শিশুদের সাহিত্য নিয়ে কাজ করে এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রকাশক এবং শিশু-কিশোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ নিয়ে তেমন উদ্যোগী নয়। পত্র-পত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনেও এই দিবসের বার্তা তেমন পৌঁছায়নি বলেই মনে হয়।

 

তবে শিশুদের জন্য মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশ, গ্রন্থে হৃদয়গ্রাহী ছবি সংযোজন এবং ছোটদের পাঠপ্রবণতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জাগরণ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক শিশুগ্রন্থ দিবস ব্যাপকভাবে পালিত হওয়া উচিত। মুখ্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঘোষিত হোক বা না হোক—বাংলাদেশ হোক ইবিবিওয়াই-এর পরিবারভুক্ত।

লেখক: শিক্ষাব্রতী, প্রাবন্ধিক ও কবি।

 

পূর্বকোণ/সিজান/পারভেজ

শেয়ার করুন