চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২৬

সচেতনতার সময় এখনই

ডিপফেক প্রযুক্তি

সচেতনতার সময় এখনই

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২ এপ্রিল, ২০২৬ | ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নতুন ঝুঁকি- ডিপফেক। পাঠকদের সচেতনতার স্বার্থে বিষয়টি আজ সংক্ষেপে তুলে ধরা প্রয়োজন, কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার যে কতটা সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা আমরা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছি।

 

ডিপফেক মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর ও অভিব্যক্তিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে। এর পেছনে কাজ করে মেশিন লার্নিং এবং বিশেষত জেনারেটিভ অ্যাডভারসারিয়াল নেটওয়ার্ক। এই পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তির বহু ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এমন একটি কৃত্রিম মডেল তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেই ব্যক্তির উপস্থিতি তৈরি করতে পারে- যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি।

 

এক সময় ছবি বিকৃত করা তুলনামূলক সহজ হলেও ভিডিও নকল করা ছিল কঠিন। কিন্তু ডিপফেক প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছে। এখন এমন ভিডিও তৈরি সম্ভব, যেখানে কণ্ঠস্বর, চোখের দৃষ্টি, এমনকি সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিও হুবহু অনুকরণ করা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর অপব্যবহার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা, যেমন Deeptrace Labs, দেখিয়েছে যে ডিপফেক কনটেন্টের একটি বড় অংশই অপমানজনক বা অশালীন উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। বিশেষ করে নারীরা এর প্রধান ভুক্তভোগী। একটি নিরীহ ছবি ব্যবহার করেই কাউকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা সম্ভব হচ্ছে- যার প্রভাব ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থানের উপর মারাত্মক।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। Facebook ও Instagram-এ প্রকাশিত ব্যক্তিগত ছবি সহজেই সংগ্রহ করা যায়, যা ডিপফেক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে WhatsApp ও Messenger তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত হলেও, একবার কোনো ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রæত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এছাড়া TikTok ও Telegram-এর মতো প্ল্যাটফর্মেও গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে অপব্যবহারের নজির বাড়ছে।

 

তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি- শুধু ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া মানেই বিপর্যয় অনিবার্য নয়। বরং ঝুঁকি বাড়ে অসচেতনতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকাশ্যতা এবং নিরাপত্তাহীন ব্যবহারের কারণে। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা।

 

নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু মৌলিক পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে সংযমী হওয়া উচিত এবং প্রাইভেসি সেটিংস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অচেনা ব্যক্তি বা সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট থেকে আসা অনুরোধ এড়িয়ে চলা বাঞ্ছনীয়। তৃতীয়ত, দুই-স্তরের নিরাপত্তা (Two-Factor Authentication) চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, কোনো সন্দেহজনক ভিডিও বা অডিও দেখলে তা যাচাই না করে বিশ্বাস করা বা ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ডিজিটাল সচেতনতা। পরিবার, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এই বিষয়ে অবহিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আইন ও ব্যবস্থা যতই থাকুক, ব্যক্তিগত সতর্কতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধই প্রথম প্রতিরক্ষা।

 

ডিপফেক প্রযুক্তি আমাদের সময়ের এক কঠিন বাস্তবতা। এটি যেমন সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, তেমনি অপব্যবহারে সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমাদের করণীয় একটাই- প্রযুক্তিকে নয়, প্রযুক্তির অপব্যবহারকে প্রতিরোধ করা।

 

শেষ কথা- ডিজিটাল জগতে সচেতন থাকুন, যাচাই ছাড়া কিছু বিশ্বাস করবেন না এবং নিজের পরিচয় সুরক্ষিত রাখুন।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট