
চট্টগ্রামের একটি সরকারি শিশু প্রতিষ্ঠানের ছোট্ট আঙিনায় হঠাৎ করেই জমে ওঠে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। যাদের জীবনে ঈদ মানেই নীরবতা, সীমিত আয়োজন আর অভাবের এক চাপা অনুভূতি—সেই শিশুদের জন্য এই দিনটি হয়ে উঠল একেবারেই ব্যতিক্রম। কারণ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঈদের দিনে তাঁর পরিবারকে একান্ত সময় না দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ঠিক এই শিশুদের মাঝখানে—যাদের অনেকেরই নেই বাবা-মায়ের স্নেহময় স্পর্শ।
যখন জেলা প্রশাসক নিজ হাতে শিশুদের মাঝে সালামি তুলে দিতে শুরু করলেন, তখন দৃশ্যটি হয়ে উঠল একেবারেই আবেগঘন।হাসির শব্দ, হাততালি আর আনন্দের উচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই বদলে গেল পুরো পরিবেশ। ১৭১ জন মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু—যাদের অনেকেরই বাবা-মা আছে, কিন্তু নেই কোনো খোঁজ।
আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপলব্ধির আশ্রয়ে বড় হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের ভার নিয়ে আরো ৮৪ জন কন্যাশিশু।সরকারি ছোট মনি নিবাসে আশ্রয়ে রয়েছে ১৬টি ছোট্ট প্রাণ—যাদের পরিচয় পর্যন্ত অজানা, যারা বিভিন্ন সময় হারিয়ে গিয়ে পুলিশের মাধ্যমে আশ্রয় পেয়েছে। তারা কেউ জানে না তাদের শিকড় কোথায়। এই শিশুদের কাছে ঈদ মানে সাধারণত অন্যদের আনন্দ দূর থেকে দেখা। কিন্তু এবার সেই দূরত্ব ভেঙে দিল একটি উদ্যোগ—একজন জেলা প্রশাসকের আন্তরিকতা।
এই প্রতিষ্ঠানের হাউজ প্যারেন্ট এনামুল হক, যিনি আটাশ বছর ধরে এখানে কর্মরত, এই অভিজ্ঞতাকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি এই দুই যুগেরও বেশি সময়ের মধ্যে কখনো দেখিনি একজন ডিসি ঈদের দিন এখানে এসে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি প্রতিটি শিশুকে নিজের হাতে ঈদের সালামি দিয়েছেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।”
সরকারি শিশু পরিবারের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট তাসনিম আক্তার বলেন, “ডিসি স্যার আমাদের প্রতিটি শিশুকে সরাসরি নিজে হাতে ঈদের সালামি দিয়েছেন। তিনি শিশুদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক। শিশুরা ডিসি স্যারকে ঈদের দিন পেয়ে খুবই খুশি। এতিম ও দুস্থ এই শিশুরা ডিসি স্যারের কাছ থেকে ঈদ সালামি পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত। ডিসি স্যার শিশুদের জন্য মিষ্টি ও বিভিন্ন সুস্বাদু ফল নিয়ে এসেছিলেন।”
ছোট মনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান আবেগভরে বলেন, “আমাদের এখানে ১৬ জন শিশু আছে, যারা বিভিন্ন সময় হারিয়ে গিয়েছিল। পরে পুলিশের মাধ্যমে এখানে আশ্রয় পেয়েছে। আমরা কখনো ভাবিনি জেলা প্রশাসক ঈদের দিনে পরিবারের সঙ্গে সময় না দিয়ে আমাদের এখানে পরিদর্শনে আসবেন। শিশুরাও কখনো কল্পনা করেনি তাদেরকে ডিসি স্বয়ং এসে ঈদের সালামি দেবেন। ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা আজ দারুণ খুশি।”
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসকের কণ্ঠে ছিল এক গভীর উপলব্ধি। তিনি বলেন, “আমরা আজ ঈদের দিনে অনেক আনন্দ পেয়েছি। ঈদ মানেই সবার জন্য আনন্দ। আজ আমরা সবাইকে নিয়ে এখানে এসেছি, আর সবার খুশি দেখে আমরা খুবই আনন্দিত হয়েছি। ঈদ মানে হাসি, ঈদ মানে খুশি। আমরা সবার মুখে হাসি দেখতে চাই।”
পূর্বকোণ/রাজীব