
বাবা হওয়ার পর পৃথিবীটা যেন নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশ। পরিবার নিয়ে বাইরে বেরোলেই বারবার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। জনসমক্ষে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেতেন না তাঁর স্ত্রী। সেই অস্বস্তি, সেই না পারার বেদনা থেকেই জন্ম নেয় এক স্বপ্ন।
ব্যাচেলর পয়েন্টে ‘কাবিলা’ চরিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনেতা তখনই সংকল্প করেন-মায়েদের জন্য এমন একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করবেন, যেখানে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে কোনো সংকোচের মুখে পড়তে হবে না। নিজের ডাকবাক্স ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পলাশের দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবের আলো দেখছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় বন্দরনগরীতে শুরু হচ্ছে তাঁর স্বপ্নের ব্রেস্টফিডিং প্রকল্প-‘যতন’। একজন বাবার ছোট্ট কষ্ট থেকেই যেন জন্ম নিচ্ছে অনেক মায়ের স্বস্তির আশ্রয়। প্রথম ধাপে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নগরে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্রেস্টফিডিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। স্পটগুলো হলো শাহ আমাতন সেতু সংলগ্ন এলাকা, পতেঙ্গা, কদমতলী কারখানা এলাকা, আগ্রাবাদ এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন।
পুরো প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। চসিক ও ডাকবাক্স যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। ইতিমধ্যে শাহ আমনত সেতুর মুখে পুলিশ বক্স এলাকায় ব্রেস্টফিডিং সেন্টারের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে সেটির উদ্বোধন করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের কাজ দ্রæত এগিয়ে চলছে। দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ দাঁড়িয়ে গেছে। বাকি কাজ দ্রæত শেষ করতে শ্রমিকেরা টানা কাজ করে যাচ্ছেন।
এই নির্মাণকাজের বেশ কয়েকটি ভিডিও এবং ছবি নিজের ফেসবুকে দিয়েছেন জিয়াউল হক পলাশ। সেখানে এই অভিনেতা লেখেন, ‘চট্টগ্রামে মা ও শিশুদের জন্য আমার ড্রিম প্রজেক্টের কাজ শুরু হলো। অনেকদিন এই কাজটার পেছনে আমি লেগে ছিলাম। আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠান ডাকবাক্স ফাউন্ডেশন থেকে মা ও শিশুদের জন্য ব্রেস্টফিডিং সেন্টার নির্মাণ করছি। নাম দিয়েছি যতন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে বরাদ্দ পাওয়া পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই সেন্টারগুলো হবে। আমি নিজ থেকেই অনেক স্বপ্ন আর সাহস নিয়ে শুরু করলাম। আপনাদের সাপোর্ট পেলে আরও জোরেশোরে আমাদের কাজটা এগিয়ে নিতে পারবো।’
চট্টগ্রামবাসীকে এই উদ্যোগে শরীক হওয়ার আহ্বান জানান এই জনপ্রিয় অভিনেতা। লেখেন, ‘জনবহুল স্থানে অনেক মায়েরা তাদের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারেন না। তাদের এই কষ্টের কথা ভেবে উদ্যোগ নিলাম। চট্টগ্রামবাসী আপনারাও আমার এই উদ্যোগে শরীক হইয়েন। আপনাদেরই মা, বোন, স্ত্রী কারো না কারো উপকারে আসবে। যে যার জায়গা থেকে যতটুকু পারেন আমাদের আর্থিকভাবে সাপোর্ট দিয়েন।’ মন্তব্যের ঘরে সহযোগিতা কীভাবে করা যাবে তার বিস্তারিত দেন পলাশ।
নির্মাণ ও অভিনয়ের পাশাপাশি নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছেন জিয়াউল হক পলাশ। শীতকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ, অসুস্থ ও অসহায় রোগীর চিকিৎসায় সহায়তা, জরুরি রক্তের সংস্থান-এমন নানা মানবিক কাজে সক্রিয় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডাকবাক্স ফাউন্ডেশন। সেই ফাউন্ডেশন থেকেই এবার হচ্ছে ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার। কিছুদিন আগে এই ব্রেস্টফিডিং প্রকল্পের প্রস্তাবনা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে উপস্থাপন করে ফাউন্ডেশনটি। সে সময় অভিনেতা নিজেই উপস্থিত ছিলেন।
সম্প্রতি শাহ আমানত সেতু এলাকায় ব্রেস্টফিডিং সেন্টারের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের সময় সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই প্রকল্পের ভ‚য়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘শিশুর সুস্বাস্থ্য ও মায়ের মর্যাদা রক্ষায় ব্রেস্টফিডিং সেন্টার একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ। এটি শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং মানবিক নগর গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।’
শাহ আমানত সেতু এলাকায় নির্মাণাধীন প্রকল্পটি দেখে কৌতুহলী হয়ে দাঁড়ান শাহেনা আক্তার নামের এক নারী। তখন ব্রেস্টফিডিং নির্মাণের পুরো বিষয়টি জানার পর এই মা বলেন, ‘এখান থেকেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং কক্সাবাজার ও বান্দরবানের বেশিরভাগ যানবাহন ছাড়ে ও থামে। এতদিন শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে মায়েদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হতো। এই সেন্টার হলে সেই কষ্ট অনেকটাই কমবে।’
অভিনয়ের মঞ্চে জিয়াউল হক পলাশ মানুষকে হাসান, আনন্দ দেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে ‘কাবিলা’ যেন দেখিয়ে দিলেন-একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, সমাজের প্রতিও!
পূর্বকোণ/সিজান/পারভেজ