চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

অভিমত

যুদ্ধের আরেক ফ্রন্ট ‘ভুয়া তথ্য’

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১২ মার্চ, ২০২৬ | ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক যুদ্ধে গোলাবারুদ, ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী অস্ত্র ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে সেটা হচ্ছে- তথ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন সৈন্যরা লড়াই করে, তেমনি সামাজিক মাধ্যমে চলছে আরেকটি অদৃশ্য যুদ্ধ-তথ্যের যুদ্ধ। এখানে সত্য, অর্ধসত্য ও সম্পূর্ণ মিথ্যা খবর মিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। দুই পক্ষই কেন সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া খবর বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়ায়- এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রথমত জনমত, নিয়ন্ত্রণের জন্য। যুদ্ধের সময় সরকার বা যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলো চায় তাদের নাগরিকরা যেন বিশ্বাস করে যে তাদের অবস্থান ন্যায্য এবং তারা বিজয়ের পথে আছে। তাই অনেক সময় নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কম দেখানো হয় এবং প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি অতিরঞ্জিত করা হয়। এতে জনগণের মনোবল বজায় থাকে।

 

দ্বিতীয়ত, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে। শত্রুপক্ষের সৈন্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, বিভ্রান্তি বা হতাশা সৃষ্টি করতে মিথ্যা খবর ব্যবহার করা হয়। যেমন- কোনো শহর পতনের গুজব, কোনো নেতার মৃত্যু বা সেনাবাহিনীর ভাঙনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া। এতে প্রতিপক্ষের মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।

 

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জনমত, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সামাজিক মাধ্যমে এমন ছবি, ভিডিও বা গল্প ছড়ানো হয় যা বিশ্ববাসীর সহানুভূতি অর্জন করতে পারে।

 

চতুর্থত, তথ্যের জট তৈরি করা। কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এত বেশি পরস্পরবিরোধী তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই ‘তথ্যের কুয়াশা’ তৈরি হলে সত্য লুকিয়ে রাখা সহজ হয়ে যায়।
সামাজিক মাধ্যম এই প্রচারণাকে আরও দ্রুত ও শক্তিশালী করে তুলেছে। একটি ভিডিও বা ছবি কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয়।

 

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ পাঠকের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ভুয়া খবর শনাক্ত করার কিছু সহজ কৌশল জানা।

 

প্রথমত, খবরের উৎস যাচাই করুন। কোনো তথ্য যদি অজানা ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল বা ব্যক্তিগত একাউন্ট থেকে আসে, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে একই খবর প্রকাশিত হয়েছে কি না তা দেখুন।

 

দ্বিতীয়ত, একাধিক উৎসে মিলিয়ে দেখুন। একটি খবর সত্য হলে সাধারণত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বা জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও তার উল্লেখ থাকে। যদি একটি মাত্র উৎসে দেখা যায়, তবে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

 

তৃতীয়ত, ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। অনেক সময় যুদ্ধের পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ছবিটি অন্য কোনো ঘটনার কি না তা যাচাই করতে এখন অনলাইনে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ ব্যবহার করা যায়।

 

চতুর্থত, অতিরঞ্জিত বা আবেগী ভাষা লক্ষ্য করুন। ভুয়া খবর সাধারণত খুব উত্তেজনাপূর্ণ ভাষায় লেখা হয়- যেমন ‘অবিশ্বাস্য’, ‘দেখতেই হবে’, ‘সত্য লুকানো হচ্ছে’- ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয় যাতে মানুষ দ্রুত শেয়ার করে।

 

পঞ্চমত, তাড়াহুড়ো করে শেয়ার করবেন না। কোনো খবর সত্য কিনা নিশ্চিত না হয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি বাড়ায়।

 

অতএব, আধুনিক যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন আমাদের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেও উপস্থিত। তাই সচেতন পাঠক হওয়া এবং তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে খুঁজে নেওয়ার এই দায়িত্ব এখন কেবল সাংবাদিক বা রাষ্ট্রের নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট