
চট্টগ্রাম আমার কাছে স্রেফ একটি জেলা বা স্রেফ একটি শহর নয়। চট্টগ্রাম আমার কাছে অক্সিজেনের মতো, যেন কষ্টকর ক্লান্তির পর প্রশান্তির ঘুম। আমি বেশিদিন চট্টগ্রামের বাইরে থাকতে পারি না, দম বন্ধ হয়ে আসে। এর বাইরে, চট্টগ্রামের কিছু বিশেষত্বকে ঠিক এভাবে প্রকাশ করা যায় যেমন, পৃথিবীতে খুব কম শহরই আছে যেখানে একসাথে সমুদ্র, নদী এবং পাহাড় এই তিনটি প্রাকৃতিক সমৃদ্ধির সমাগম দেখা যায়। কেউ চাইলেই চট্টগ্রামের ভাষা শিখতে পারবে না। শিখতে চাইলে তাকে চট্টগ্রামে থাকতে হবে, এখানকার জল–হাওয়া গায়ে মাখতে হবে। এখানে আপনি কারো বাসায় যাবেন কিন্তু কিছু না খেয়ে ফিরে যাবেন এটা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ধরুন এমন সময় গেলেন দুপুরের খাবার কিংবা রাতের খাবারের আরো দুই তিন ঘণ্টা বাকি আপনাকে ওখানে বসে সেটাও খেয়ে আসতে হবে। অতুলনীয় এখানকার খাদ্যরসনা। রূপচাঁদা মাছের কড়া ভাজি, সামুদ্রিক মাছের ঝোল, লইট্টা মাছ ভুনা, লইট্টা শুটকি ভুনা, খাইসা দিয়ে ছুরি শুটকি, সিম টমেটো আলু ফুলকপি দিয়ে ছুরি শুটকির ঝোল, মধু ভাত, চনা মনার ঠ্যাং, লেবুর কাজী সহ আরো অনেক কিছুৃ পৃথিবীর আর কোথাও চট্টগ্রামের রান্নার স্বাদ পাওয়া যাবে না।
তবে ভূ্বনজয়ী কোনও পদের কথা যদি বলা হয়, তাহলে চট্টগ্রামের রসনা তালিকায় এক নম্বরে আছে ঐতিহ্যবাহী “মেজবান”। খাবারের এই ‘মেজবান’ পদ, অধুনা যাকে “মেজবান সংস্কৃতি’’ নামেও ডাকা হয়, তা চট্টগ্রামের সীমানা পেরিয়ে পুরো বাংলাদেশ ছড়িয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকায় অহরহ দেখা যায় মেজবানি পরিবেশনার লোভনীয় সাইনবোর্ড সম্বলিত রেস্টুরেন্ট। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই এর মৌলিক স্বাদ যে কোনো খাবারের স্বাদের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। তবে সবচাইতে অবাক করা আর ভালো লাগার খবরটা হচ্ছে গত জানুয়ারিতে এই চট্টগ্রাম থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ম্যাগাসিটি টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মেজবানের ভিন্ন মাত্রার এক আয়োজন।
এমন একটি আয়োজন হতে যাচ্ছে এটা জানার পর থেকে আমি প্রতিনিয়ত সেই আয়োজনের খুঁটিনাটি খবর নিয়েছি, সেসব নিয়েই বাকি আলোচনাটুকু করব। কানাডার বিভিন্ন বড় শহরে প্রবাসী বাঙালিরা বছরে দু’একবার পিকনিক, পুনর্মিলনী আয়োজন করে এবং সেখানে মেজবান অত্যাবশ্যকীয় সেট মেনু থাকে। তবে এই আয়োজনটি একটু ভিন্ন মাত্রার ছিল। ইভেন্টটি আয়োজন করেছিল টরেন্টাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘চিটাগং কিচেন’, যার কর্ণধার মেহরাব মুসা এবং লামিসা আশিক দম্পতি। দুজনেরই জন্ম, বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। শীতপ্রধান দেশের ব্যস্ত জীবনে তাদের কল্পনায় তাই প্রায়ই ধরা দেয় তাদের প্রাণের শহর চট্টগ্রাম আর ধোঁয়া ওঠা সেদ্ধ চালের ভাত আর মেজবানি তরকারি। সেই ভাবনা থেকেই শুরু, অন্য পেশার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মেজবানি রান্নার সকল প্রস্তুতি আর প্রশিক্ষণ শেষে গড়ে তুললেন ‘চিটাগং কিচেন’ নামের ক্যাটারিং রেস্টুরেন্ট। আর সেই প্রতিষ্ঠানেরই সহযোগিতায় আয়োজন করলেন মেজবানি ডিনার, আর্ট ও মিনিয়েচার এক্সিবিশন, সেইসাথে বাংলা গানের পরিবেশনায় এক অনবদ্য সন্ধ্যা। সীমিত আসন সংখ্যার এই আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবই ছিল অসাধারণ, মনোমুগ্ধকর। মেজবানির সবগুলো আইটেম দিয়ে খাবার পরিবেশনা তো ছিলই, সাথে ছিল ঝাল মুড়ি আর হালুয়া। পুরো আয়োজনের রান্নার মূল কারিগর ছিলেন মেহেরাব মুসা। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা বলছিলেন, তার হাতে যেন স্বাদের এক বিশেষ গভীরতা ও পরিমিত দক্ষতা রয়েছে। টরেন্টোর জর্জ ব্রাউন পলিটেকনিকের শেফ স্কুলে কুলিনারি আর্টসে অধ্যয়নরত এবং সার্টিফায়েড ফুড হ্যান্ডলার হিসেবে পেশাদারভাবে খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনার সাথে যুক্ত আছেন তিনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে চান মুসা। তাঁর কাজের মূল ভিত্তি বাংলাদেশি রান্নার বৈচিত্র্য, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তের স্বাদ ও রন্ধনশৈলি, যেখানে থাকবে স্বাস্থ্যকর–পুষ্টিকর খাবারের প্রতি সচেতনতা, আধুনিক কুলিনারি টেকনিক এবং সমসাময়িক উপস্থাপনার সংমিশ্রণ। তাঁর দৃষ্টিতে খাবার শুধু খাদ্যবস্তুই নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক শক্তিশালী ভাষা। এই আয়োজনটির আরেকটি পরিবেশনা ছিল মেজবানি খাবারের ইতিহাস এবং এর রন্ধন প্রক্রিয়াটি আলাদাভাবে উপস্থাপন করা, পাশাপাশি মেজবানির রান্নার বিশেষায়িত মসলাগুলোর প্রদর্শনী। অতিথিরা ঝাঁজালো মসলার স্পর্শ আর ঘ্রাণ নিয়ে এই রান্নার ইতিহাস জেনে তারপর এই মেজবানি ডিনারের আসল স্বাদ মন ভরে চেটেপুটে অনুভব করেছেন। শুধু মেজবানি পদের খাবার আয়োজনেই সীমিত ছিল না এটি। অতিথিরা মিনিয়েচার এবং আর্ট এক্সিবিশন করেন, বেশকিছু মিনিয়েচার ক্র্যাফট এবং আর্টও তারা সংগ্রহ করেন। আর্ট এক্সিবিশনে শিল্পী লামিসা আশিক এবং সারাফ সাইরার শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। হ্যান্ডক্রাফটে চট্টগ্রামের গ্রামীন এলাকার সওদাগর বাড়ি, পার্বত্য সুন্দরী সাজেকের মেঘে ঢাকা পাহাড়, দুর্বার কক্সবাজারের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, পাহাড়ে নিখুঁত হাতে সাজানো চা বাগান, চরে বিশ্রাম নেয়া ডিঙ্গি নৌকা, কাপ্তাই এর গম্ভীর–স্তব্ধ হ্রদ, এই চিত্রকর্মগুলো যেন মুহূর্তেই সবাইকে ভুলিয়ে দিয়েছিল যে তারা নিত্যদিনের দৌড়ঝাঁপ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। এক্সিবিশন হল ঘিরে শোভা পাচ্ছিল চট্টগ্রামের মানচিত্র, চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টমেট্রো বোর্ড সম্বলিত সিএনজি ট্যাক্সি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ডায়লগ লেখা টি–শার্ট, পাউচ এবং ফ্রিজ ম্যাগনেট, যা শিল্পী লামিসার ডিজাইন করা। এক্সিবিশন এর শেষ পর্বে বাংলা গানও পরিবেশন করেন এই শিল্পী। পাশাপাশি অতিথি শিল্পী হিসাবে গান পরিবেশন করেন চট্টগ্রামের ব্যান্ড সংগীতের সূচনাকারী দল সোলসের মেধাবী মিউজিসিয়ান পিলু খানের ছেলে দামির খান।
অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আয়োজক মেহরাব এবং লামিসা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, “টরন্টোতে শুধু বাংলাদেশী নয় মাল্টি কালচারাল দেশ হিসেবে পৃথিবীর সকল দেশের মানুষের বসবাস এই শহরে, ভিনদেশীদের এবং বাংলাদেশী নতুন প্রজন্মের কাছে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি, খাদ্য রসনা, ঐতিহ্য আধুনিকতার সাথে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।” আসলেই সব মিলিয়ে এক অনবদ্য মেজবানি এক্সিবিশন সন্ধ্যা উপহার দিয়েছে তারা। তাদের প্রতিটা আয়োজন যেন ছুঁয়েছিল এই চট্টগ্রামের মাটি, ঘ্রাণ, আলো আর বাতাসের স্পর্শ।
পূর্বকোণ/কায়ছার