
মধ্যপ্রাচ্য এমন এক ভূরাজনৈতিক অঙ্গন, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, জ্বালানি সম্পদ এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা একসূত্রে গাঁথা। এই অঞ্চলে সংঘাত যেন চক্রাকারে ফিরে আসে— কখনও সরাসরি যুদ্ধ, কখনও প্রক্সি লড়াই, কখনও অর্থনৈতিক অবরোধ, আবার কখনও কূটনৈতিক চাপ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে এক নতুন সংকটপর্বে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শহীদ হওয়ার খবরে এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক সীমারেখা অতিক্রম করেনি, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আজ বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- এই আগ্রাসনের পরিণতি কি সীমিত সামরিক বিনিময়ে শেষ হবে, নাকি তা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও বহুমাত্রিক সংঘাতে রূপ নেবে?
উল্লেখ্য, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হঠাৎ করে হয়নি; এর শিকড় ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ইসলামি বিপ্লবে প্রোথিত। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান এবং পশ্চিমা প্রভাব প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে ইরান এক নতুন আদর্শিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা করে। ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন-তেল আবিবের মধ্যে অবিশ্বাস ক্রমেই গভীর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জিম্মি সংকট, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতি— সব মিলিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্ক বৈরিতার ধারাবাহিকতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই বৈরিতা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আদর্শিক, কৌশলগত এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এই উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তোলে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করে এসেছে যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনের আড়ালে সামরিক সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করেছে তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, তবু আন্তর্জাতিক সন্দেহ প্রশমিত হয়নি। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে উত্তেজনা আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে, কিন্তু একইসঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরে ‘অবরুদ্ধ রাষ্ট্র’ মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করে।
ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব— সব মিলিয়ে তেল আবিবের কাছে তেহরান একটি বিস্তৃত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যৌথ সামরিক অভিযান ছিল বহুবছরের নিরাপত্তা-আশঙ্কা ও কৌশলগত পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ।
এই হামলার পরিধি ও তীব্রতা আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে। সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হলেও বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণ এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির খবর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালা স্পষ্টভাবে বলে— বেসামরিক জনগণ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আবাসিক এলাকায় আঘাত হানা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার ধার ধারেনি কোনো সময়। এবারও ইরানে নির্বিচারে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের বর্বর আগ্রাসন থেকে রেহায় পায়নি কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় এবং শিশুবিদ্যাপীঠও। বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য ও ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন এড়ানো যায় না। যদি কোনো হামলায় শিশু, নারী বা নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারায়, তবে তা শুধু কৌশলগত নয়, মানবিক সংকটও সৃষ্টি করে।
এবার ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত ও কঠোর। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষতি সাধান করেছে। এই পাল্টা আঘাত স্পষ্ট বার্তা দেয়— তেহরান সরাসরি আঘাতের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। সংঘাতের এই ধাপেই আঞ্চলিক বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়। পারস্য উপসাগর, লেভান্ত অঞ্চল এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো এমন এক কৌশলগত পরিবেশে অবস্থান করছে, যেখানে সামান্য উত্তেজনাও বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
যদিও সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে বহুস্তরীয় নেতৃত্ব তৈরি থাকায় পরিস্থিতি তেমন জটিল রূপ নেবে মনে হয় না। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী বিশেষ পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচন করবে, কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার রূপান্তর সবসময় সহজ হয় না। ইরানের শাসনব্যবস্থা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত; ফলে নেতৃত্বের প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক নয়, আদর্শিক ধারাবাহিকতার সঙ্গেও জড়িত। ইতিহাসে দেখা গেছে, বহিরাগত আক্রমণ প্রায়ই অভ্যন্তরীণ বিভাজন সাময়িকভাবে স্তিমিত করে জাতীয়তাবাদী ঐক্য গড়ে তোলে। আবার কখনও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার বীজ বপন করে। ইরানের ক্ষেত্রে এবার কোনটি ঘটবে, তা নির্ভর করবে নেতৃত্বের রূপান্তর কতটা মসৃণভাবে সম্পন্ন হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর থাকে তার ওপর। তবে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ইরানের রেজিম চেঞ্জের যে স্বপ্ন দেখছেন তা সহজে পূরণ হবে না।
সংঘাতের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। যদি ইরান এই পথ বন্ধ করে দেয় বা চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেবে। তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে— জ্বালানি ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জ্বালানিনির্ভর শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে।
এখানেই শেষ নয়; জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলবে। শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা, মুদ্রার ওঠানামা এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার, মুদ্রানীতি ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পার্থক্য সংকট মোকাবিলায় বৈষম্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণও নতুনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে। চীন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে, কারণ তাদের অর্থনীতি জ্বালানি বাজারের ওঠানামার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উঠলে স্থায়ী সদস্যদের ভিন্ন অবস্থান ভেটো রাজনীতিকে সামনে আনতে পারে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে সংঘাতের প্রতিক্রিয়া আর একরৈখিক থাকে না; বরং তা জটিল কূটনৈতিক সমীকরণে আবদ্ধ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই সংঘাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক সম্পৃক্ততার পর মার্কিন জনগণের মধ্যে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ নিয়ে ক্লান্তি রয়েছে। নতুন সামরিক অভিযান স্বল্পমেয়াদে শক্ত অবস্থানের বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং মিত্রদেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখা সহজ হবে না। অর্থনৈতিক ব্যয়, সৈন্য মোতায়েন এবং আঞ্চলিক জটিলতা— সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে উঠবে।
ইসরায়েলের জন্যও এই সংঘাত দ্বিমুখী। একদিকে তারা মনে করতে পারে যে সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে আগাম পদক্ষেপ জরুরি; অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বহু ফ্রন্টে চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। উত্তরে লেবানন সীমান্ত, দক্ষিণে গাজা, পূর্বে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা— সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংঘাতের আরেকটি মাত্রা হলো সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ। আধুনিক সংঘাতে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান নয়, সাইবার আক্রমণ, অবকাঠামো হ্যাকিং এবং ভ্রান্ত তথ্য প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক— এসব খাতে সাইবার হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং কৌশলগত বার্তা পৌঁছে দেওয়াও এখন যুদ্ধের অংশ।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই সংঘাত বহুমাত্রিক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মরত, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আঞ্চলিক অস্থিরতা তাঁদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি শিল্প, পরিবহন ও কৃষিখাতে চাপ সৃষ্টি করবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব পড়তে পারে, আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ বাংলাদেশকে একদিকে পশ্চিমাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে মুসলিমবিশ্বের সংবেদনশীলতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মানবিক দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। যুদ্ধ মানেই বাস্তুচ্যুতি, শরণার্থী সংকট এবং মানসিক ট্রমা। যদি সংঘাত বিস্তৃত হয়, তবে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় খুঁজতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলো নতুন মানবিক চাপের মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপরও বাড়তি দায়িত্ব আসবে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং সামাজিক পুনর্বাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
এই পরিস্থিতি তিনটি সম্ভাব্য পথে অগ্রসর হতে পারে। প্রথমত, সীমিত সামরিক বিনিময়ের পর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হয়ে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যেখানে একাধিক রাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়বে। তৃতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সাইবার সংঘাতের মাধ্যমে এক ‘নিম্নমাত্রার কিন্তু স্থায়ী’ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। প্রতিটি পথেরই নিজস্ব ঝুঁকি ও পরিণতি রয়েছে।
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুব কমই সম্ভব হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান বা লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে— শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া সহজ, কিন্তু স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন অত্যন্ত কঠিন। বহিরাগত হস্তক্ষেপ প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনে। তাই কূটনীতি, সংলাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সংযোগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, একটি আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাতও মহাদেশ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ইরানকে কেন্দ্র করে এই আগ্রাসন কেবল একটি দেশের রেজিম চেঞ্জ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নয় শুধু; এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক নীতিমালার কার্যকারিতা এখন পরীক্ষার মুখে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— বিশ্ব কি প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রাধান্য দেবে, নাকি সংলাপের পথ বেছে নেবে? যদি শক্তির প্রদর্শনই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা, তবে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে, তবে সংকট থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে প্রজ্ঞা, সংযম ও দূরদর্শিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিশ্ব যে পথে এগোবে, তা নির্ধারণ করবে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার দিকনির্দেশনাও।
পূর্বকোণ/কায়ছার