
সাম্প্রতিক ইরানে হামলা এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। এর আগে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো-কে ক্ষমতাচ্যুত করার পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে জ্বালানি রাজনীতিকে আরও তীব্র করে তোলে। এই দুই ঘটনার পেছনে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং বৃহত্তর এক কৌশল কাজ করছে— যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘এনার্জি ডমিন্যান্স’ নীতি, যার মূল লক্ষ্য কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে চাপে রাখা।
সস্তা তেল ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ভাঙার কৌশল
ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সুযোগে চীন দীর্ঘদিন ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার করে বাজারদরের চেয়ে ১৫-২০ ডলার কমে তেল কিনে এসেছে। এই সস্তা জ্বালানি চীনের স্বতন্ত্র রিফাইনারি ও শিল্পখাতকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছিল।
ওয়াশিংটনের কৌশল ছিল দ্বিমুখী—ভেনেজুয়েলার তেল আয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং ইরানের ওপর সামরিক-অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। এর ফলে চীনের ‘ডিসকাউন্টেড অয়েল’ প্রবাহ সংকুচিত হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বৈশ্বিক বাজারদর মেনে তেল কিনতে বাধ্য হয় বেইজিং।
আঞ্চলিক প্রভাব কমানো চীন বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর ‘শেষ ভরসা ক্রেতা’ হয়ে লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরি বলেছেন— এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিছনের আঙিনা’-য় প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থান শক্ত করেছে। ভেনেজুয়েলার তেল পুনর্নির্দেশ করে ভারত বা অভ্যন্তরীণ বাজারে দেওয়ার পরিকল্পনা সেই প্রভাব কমানোর অংশ।
ফসিল ফুয়েল বনাম সবুজ রূপান্তর
২০২৬ সালে এক ধরনের ‘স্প্লিট স্ক্রিন’ বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানিতে জোর দিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে। বিপরীতে চীন বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌর প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতৃত্ব ধরে রেখেছে। অনেকে মনে করেন, তেল-গ্যাসের জোগান বাড়িয়ে দাম কমিয়ে রাখলে বিশ্বে সবুজ রূপান্তরের জরুরি তাগিদ কমে যাবে— যেখানে চীন এগিয়ে। কিন্তু এই কৌশলের উল্টো ফলও হতে পারে: তেলকে ‘অস্ত্র’ বানানো হলে চীন আরও দ্রুত বিদ্যুৎনির্ভর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরে যেতে পারে।
চীনের পাল্টা কৌশল: ‘ফোর্ট্রেস ফাইন্যান্স’ ও দ্রুত রূপান্তর
সরাসরি সামরিক মোকাবিলায় না গিয়ে বেইজিং তিনটি স্তম্ভে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
১) নীরব মজুত
চীন রেকর্ড ১.৩ বিলিয়ন ব্যারেল কৌশলগত মজুত গড়েছে— চার মাসের বেশি আমদানি চাহিদা মেটানোর মতো। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান Sinopec ও CNOOC নতুন সংরক্ষণাগার বাড়াচ্ছে। ফলে দাম বাড়লে তারা আমদানি কমিয়ে বাজারচাপ সামাল দিতে পারে।
২) ‘গ্রিন এস্কেপ’
চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা জ্বালানি ব্যবহারের বদলে কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে। নতুন গাড়ির অর্ধেকের বেশি এখন নিউ এনার্জি ভেহিকল (NEV)। সৌর-বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে; কিছু প্রদেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় নেমেছে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৪ সেন্টে—ইতিহাসের সর্বনিম্নের কাছাকাছি।
৩) বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো
ডলার নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে চীন রেনমিনবির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক লেনদেনে RMB-এর অংশ বেড়ে ৩ শতাংশের বেশি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যে ডলার এড়িয়ে এই মুদ্রা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
দুই ‘কস্ট সেন্টার’র দ্বন্দ্ব
বিশ্ব জ্বালানি মানচিত্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী খরচকেন্দ্র স্পষ্ট—
যুক্তরাষ্ট্র: বিপুল তেল-গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে পাম্পের দাম ২.২৬-২.৯০ ডলারে নামিয়ে এনেছে; ২০২২ সালের তুলনায় গড় পরিবার প্রায় ৭০০ ডলার কম ব্যয় করছে।
চীন: তেলের দামের ওঠানামা উপেক্ষা করে সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে। কিছু প্রদেশে অতিরিক্ত সৌর বিদ্যুতের সময় ‘নেগেটিভ প্রাইসিং’ দেখা যাচ্ছে— যেখানে উৎপাদকরা গ্রাহককে অর্থ দেয় বিদ্যুৎ নিতে।
উপসংহার
ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কেবল শাসনপরিবর্তন বা আঞ্চলিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণের লড়াই। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর আধিপত্যের কৌশল, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক দুর্গ—এই দ্বৈরথই আগামী দশকের বিশ্বরাজনীতির দিক নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিবর্তন কেবল দূরবর্তী ভূরাজনীতি নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।