
রাতের নিস্তব্ধতা যখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে গ্রাস করে, তখনই শুরু হয় আরেক কর্মযজ্ঞ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের প্রবেশদ্বারগুলোতে এসে দাঁড়ায় পণ্যে ঠাসা ট্রাকের দীর্ঘ সারি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে আসা আনারস-আদার গন্ধ, সীতাকুণ্ডের উর্বর মাটি থেকে তুলে আনা সতেজ সবজির ঘ্রাণ আর বঙ্গোপসাগরের নোনা জল থেকে আহরিত মাছের রূপালি ঝিলিক সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এই যান্ত্রিক নগরী। এটিই চট্টগ্রামের জীবনরেখা, এক অদৃশ্য কৃষি ব্যবস্থা যা প্রতিনিয়ত পুষ্টি জোগায় প্রায় ৮৭ লাখ (২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) নগরবাসীর। কিন্তু এই কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা নানা প্রতিবন্ধকতায় শিকার। কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত কৃষিপণ্য পৌঁছানোর এই দীর্ঘ ও জটিল পথ পরিক্রমা এক জীর্ণ পরিবহন ব্যবস্থার শিকার, যা একদিকে যেমন কৃষকের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, অন্যদিকে ভোক্তার পকেটে ফেলছে বাড়তি চাপ।
চট্টগ্রামের কৃষি অর্থনীতির মানচিত্র বেশ বৈচিত্র্যময়। এর ভৌগোলিক গঠন একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমতল ও উপকূল। এখানে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হচ্ছে। চট্টগ্রামের অদূরেই রয়েছে পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি, যা ফল ও মসলার এক বিশাল ভান্ডার। বান্দরবানের পাহাড়ি কলা, আম, পেঁপে, আদা ও হলুদ, রাঙামাটির সুস্বাদু আনারস ও কাঁঠাল এবং খাগড়াছড়ির জাম্বুরাসহ নানা সবজি চট্টগ্রামের কৃষি বাজারকে করেছে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে, জেলার উপজেলাগুলোতেও সবজি উৎপাদনে পিছিয়ে নেই। সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, পটিয়া, চন্দনাইশ ও আনোয়ারাকে বলা হয় সবজির উর্বর ভূমি। সেখানে সারা বছর উৎপাদিত হয় টমেটো, বেগুন, শিম, লাউ, ফুলকপিসহ নানা ধরনের মৌসুমি সবজি। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় সামুদ্রিক মাছ চট্টগ্রামের আরেকটি প্রধান কৃষিপণ্য। নগরের ফিশারি ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মৎস্য অর্থনীতি প্রতিদিন শত শত টন মাছের জোগান দেয়। এই বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি পালন করে এখানকার পরিবহন ব্যবস্থা, যার প্রধান মাধ্যম সড়ক পথ।
এই পরিবহন ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলো ছোট-বড় ট্রাক এবং পিকআপ ভ্যান। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কিংবা দূরবর্তী উপজেলাগুলো থেকে সবজি ও ফল বোঝাই করে ৫-৭ টনের ট্রাকগুলো ছুটে আসে শহরের প্রধান পাইকারী বাজারগুলোতে। রিয়াজউদ্দিন বাজার, ইপিজেড এবং কর্ণফুলী কমপ্লেক্সের কাঁচাবাজার হলো এই পণ্যগুলোর প্রধান গন্তব্য। এখানেই মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত পণ্য খালাস হয় এবং সেখান থেকে পাইকারদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে শহরের অলিগলির খুচরা বাজারগুলোতে। তুলনামূলক নিকটবর্তী অঞ্চল, যেমন হাটহাজারী বা পটিয়া থেকে কম পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয় মিনি ট্রাক বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মাহিন্দ্রা’ ও সিএনজি ট্যাক্সি। দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ এবং উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মাছ, পান, নারিকেল ও শুঁটকি পরিবহনে সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলারে করে এই পণ্যগুলো কুমিরা বা সীতাকুণ্ড ঘাটে এসে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে সড়কপথে শহরে প্রবেশ করে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, কৃষিপণ্য পরিবহনে রেলপথের ব্যবহার চট্টগ্রামে প্রায় শূন্যের কোঠায়, যা হতে পারত একটি সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প মাধ্যম।
তবে এই যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়। এর প্রতিটি বাঁকে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, যা পুরো কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। প্রথম এবং প্রধান সমস্যাটি হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা। কৃষিপণ্যের উৎস যে প্রত্যন্ত গ্রামগুলো, সেখানকার অধিকাংশ রাস্তাই কাঁচা অথবা ভাঙাচোরা। বর্ষাকালে এই রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে, এতে পণ্য পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, অন্যদিকে ঝাঁকুনিতে পচনশীল পণ্যের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। গ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে মহাসড়কে উঠলেও স্বস্তি নেই। চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশপথ, বিশেষ করে সিটি গেট, অলংকার মোড়, অক্সিজেন এবং বহদ্দারহাট এলাকায় তীব্র যানজট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে পরিবহনে থাকা তাজা শাকসবজি, ফল ও মাছের গুণগত মান নষ্ট হতে থাকে। সূর্যের তাপে পচে যাওয়া সবজি বা গলে যাওয়া বরফের কারণে নষ্ট হওয়া মাছের ক্ষতি কৃষক বা ব্যবসায়ীকেই বহন করতে হয়। পরিবহনকালীন অপচয় এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক।
আড়তদারররা জানান, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। কৃষকরা সাধারণত পাটের বস্তা বা বাঁশের খাঁচায় অতিরিক্ত চাপে পণ্য ভর্তি করেন, যা নরম সবজি বা ফলকে থেঁতলে দেয়। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো একটি সমন্বিত ‘কোল্ড চেইন’ বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকা। হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি ছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহনে রেফ্রিজারেটেড বা শীতলীকরণ ভ্যানের ব্যবহার নেই বললেই চলে। মাছ পরিবহনে বরফ ব্যবহার করা হলেও, দীর্ঘ যানজট বা গরম আবহাওয়ায় তা যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারে না। ফল ও সবজির এই সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং এক অদৃশ্য চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে ট্রাকের ভাড়া। কিন্তু এর বাইরেও পরিবহন খাতের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় অনেকটা ওপেন সিক্রেট। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান এবং বাজারের প্রবেশমুখে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই চাঁদা আদায় করা হয়। এই অতিরিক্ত খরচ পরিবহনের চালক বহন করেন না, এটি সরাসরি পণ্যের খরচের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না, কিন্তু ভোক্তাকে সেই পণ্যটিই কিনতে হয় কয়েকগুণ বেশি দামে। এই ব্যবস্থার মূল সুবিধাভোগী হলো মধ্যস্বত্বভোগীর একটি শক্তিশালী চক্র। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের সাধারণত সরাসরি শহরে পণ্য পাঠানোর সক্ষমতা থাকে না। স্থানীয় ফড়িয়ারা গ্রাম থেকে নামমাত্র মূল্যে পণ্য কিনে তা তুলে দেয় বড় আড়তদারদের হাতে। এই আড়তদাররাই পরিবহন ভাড়া করে পণ্য শহরে পাঠান। এই বহুস্তরীয় ব্যবস্থায় প্রতিটি স্তরে মুনাফা যুক্ত হতে হতে পণ্যের দাম কৃষকের প্রাপ্ত মূল্যের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
এই সংকটের প্রভাবের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলেন প্রান্তিক কৃষক। পরিবহনের ঝুঁকি, পণ্যের অপচয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর শোষণের ফলে তারা প্রায়শই তাদের উৎপাদন খরচটুকুও তুলতে পারেন না। অনেক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে বা সময়মতো পরিবহন না পাওয়ায় ক্ষেতেই পচে যায় সোনালি ফসল, যা কৃষকদের ঠেলে দেয় ঋণের ফাঁদে। অন্যদিকে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নগরবাসীর জীবনযাত্রার ওপর। পরিবহনের এই অতিরিক্ত খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার কারণে নগরের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজির দাম প্রায়শই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি থাকে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। এই ভঙ্গুর পরিবহন ব্যবস্থা শহরের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল-অবরোধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে চট্টগ্রাম শহরে ফল ও সবজির সরবরাহ কমে যায়, যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। প্রথমত, অবকাঠামোগত উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারিভাবে গ্রামীণ রাস্তাগুলো সারা বছর পণ্য পরিবহনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি হাবগুলোতে ছোট ছোট হিমাগার বা কুলিং সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে। রেফ্রিজারেটেড ভ্যানের ব্যবহার বাড়াতে পরিবহন মালিকদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রযুক্তি এই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা আনয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা গেলে কৃষককে সরাসরি শহরের পাইকারী ব্যবসায়ী বা সুপারশপগুলোর সাথে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে কৃষক তার পণ্যের সঠিক দাম সম্পর্কে জানতে পারবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে। গ্রাম পর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। এই সমবায় সমিতিগুলো সম্মিলিতভাবে পণ্য বাজারজাতকরণ ও পরিবহনের ব্যবস্থা করলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং পরিবহন খরচও কমবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে বাজার তদারকি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কোনো অদৃশ্য শক্তি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এছাড়া সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে নৌপথের আধুনিকায়ন এবং রেলপথকে কৃষিপণ্য পরিবহনে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের কৃষি অর্থনীতির অপার সম্ভবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কৃষকের ঘাম ও শ্রমের ফসলকে যথাযথভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথটি মসৃণ করতে হবে। একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা কেবল কৃষকের মুখে হাসিই ফোটাবে না, নগরবাসীর জন্য নিশ্চিত করবে সুলভ মূল্যে পুষ্টিকর খাবারের জোগান। এই কৃষিব্যবস্থা সচল রাখার দায়িত্ব সরকার, ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজ সকলের। এর সফলতার ওপরই নির্ভর করছে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
পূর্বকোণ/পিআর