
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে অর্থনৈতিক লেনদেনের গতিপ্রকৃতিতে দেখা দিয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। একদিকে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা ও ভোটকেন্দ্রিক ব্যয়ের কারণে নগদ অর্থের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, অন্যদিকে অবৈধ লেনদেন ও ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরোপ করেছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারব্যাংক লেনদেনে ৯৬ ঘণ্টার কঠোর বিধিনিষেধ।
ফলে ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে অর্থপ্রবাহে এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকোচন’ তৈরি হয়েছে—যার প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক মাঠ, গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, এমএফএস এজেন্ট, গার্মেন্টস শ্রমিক ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
লেনদেনে অস্বাভাবিক চাপ
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে এটিএম বুথ ও কাউন্টার থেকে নগদ উত্তোলন বেড়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, “চলতি মাসে জানুয়ারির তুলনায় নগদ উত্তোলন প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।”
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। স্থানীয় বাজার, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহেও সাময়িক ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে বলে ব্যাংকিং সূত্রে জানা গেছে।
ডিজিটাল অর্থপ্রবাহে ‘ব্রেক’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ এর জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোট ৯৬ ঘণ্টা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তিগত (পারসোনাল) হিসাবের লেনদেন সীমিত রাখা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ সীমা এ হাজার টাকা। দিনে সর্বোচ্চ লেনদেন ১০ বার। এর মানে দাঁড়ায় একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দিনে লেনদেন করা যাবে।
ইন্টারব্যাংক ইনস্ট্যান্ট ট্রান্সফার (আইবিএফটি) সাময়িকভাবে বন্ধ। এনপিএসবি আওতাধীন ব্যক্তি-টু-ব্যক্তি লেনদেনেও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, নির্বাচনের সময়ে অবৈধ অর্থ লেনদেন, ভোট কেনাবেচা, প্রভাব বিস্তার কিংবা নাশকতামূলক তৎপরতায় অর্থের অপব্যবহার ঠেকানো। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে।
বিএফআইইউর নজরদারি জোরদার
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নগদ লেনদেনে নজরদারি বাড়িয়েছে। কোনও হিসাবে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি জমা বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, শুধু ডিজিটাল নয়, ব্যাংকিং চ্যানেলের বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনও এখন বিশেষ নজরদারির আওতায়।
ভোটের অর্থনীতি: চাপ ও নিয়ন্ত্রণের দ্বৈত বাস্তবতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে, ভোট কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়—এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ঘটনাও। কারণ ভোটের সময় নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হয়, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন বাড়ে, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ে। কিন্তু, একইসঙ্গে অবৈধ অর্থপ্রবাহ ঠেকাতে আরোপিত নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে অর্থনীতির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।
প্রভাব: মাঠ থেকে সাধারণ মানুষ
নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের লক্ষ্য নির্বাচনকে স্বচ্ছ রাখা। তবে এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ গ্রাহক, এমএফএস এজেন্ট ও শ্রমজীবী মানুষের ওপরও, যারা নিয়মিত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন। অনেক গার্মেন্টস শ্রমিক বেতন পেলেও সহজে নগদ তুলতে পারছেন না। কমিশননির্ভর এজেন্টদের আয়ও সাময়িকভাবে কমেছে।
নির্বাচনি মাঠে অর্থসংকট: নেতাকর্মীদের ভোগান্তি
নির্বাচনি কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন আসনের সমন্বয়কারীরা জানিয়েছেন, প্রচার-প্রচারণা, কর্মী পরিবহন, কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয়, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে এখন অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাবনার একটি আসনের এক রাজনৈতিক নেতা জানান, বিকাশ ও নগদে আগে থেকেই কিছু অর্থ রাখা থাকলেও বর্তমান বিধিনিষেধের কারণে তা কর্মীদের কাছে পাঠানো যাচ্ছে না। নগদে অর্থ পৌঁছে দিতে গেলেও প্রশাসনিক নজরদারি ও নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা রয়েছে। ফলে অনেক কর্মীকে আপাতত ধার করে খরচ চালানোর পরামর্শ দিতে হচ্ছে।
রাজশাহীর একটি আসনের এক সমন্বয়কারীর ভাষ্য, “লেনদেনের সীমা এতো কম যে বাস্তবে তা দিয়ে কোনও কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। এতে মাঠপর্যায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
সাধারণ গ্রাহকদের বিড়ম্বনা: ‘ক্যাশ-আউট বন্ধ’ বাস্তবতা
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। রাজধানীর সূত্রাপুর, ওয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায় এমএফএস এজেন্টরা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে ক্যাশ আউট বন্ধ থাকায় অনেক গ্রাহক না জেনে এসে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এক এজেন্ট বলেন, “বিকাশ, নগদ ও রকেটে নগদ উত্তোলন কার্যত বন্ধ। সীমিত আকারে শুধু সেন্ড মানি চালু আছে। বড় অঙ্কের লেনদেন সম্ভব নয়।”
গার্মেন্টস শ্রমিক ও এজেন্টদের আয়ে সংকট
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টস শ্রমিক এমএফএসের মাধ্যমে বেতন পেয়ে থাকেন। কিন্তু, ক্যাশ আউট সীমিত হওয়ায় তারা হাতে নগদ পাচ্ছেন না। ফলে বাজার করা, বাড়ি ভাড়া দেওয়া কিংবা গ্রামে টাকা পাঠানোয় সমস্যায় পড়েছেন অনেকেই।
অন্যদিকে, কমিশননির্ভর এমএফএস এজেন্টদের আয়ও এই কয়েক দিনে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। লেনদেন কমে যাওয়ায় তাদের দৈনিক কমিশনভিত্তিক উপার্জন কার্যত বন্ধ।
নগদ টাকার চাহিদা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে
ভোটকে ঘিরে নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে বসবাসরত বহু মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ভোট দিতে যাচ্ছেন। তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও ব্যক্তিগত খরচ বেড়েছে। প্রার্থীদের পাশাপাশি দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও স্বজনদেরও ব্যয় বেড়েছে। ফলে দেশে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল দুই লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকায়। জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। আর এতে স্পষ্ট হয়, নির্বাচন ঘিরে অর্থনীতিতে নগদ লেনদেনের প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙা ভাব
ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙা ভাব দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বাজার, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে লেনদেন বেড়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুব রহমান বলেন, “ভোটকে কেন্দ্র করে টাকা উত্তোলন বেড়েছে। তবে এই অর্থ আবার ব্যাংকে ফিরে আসবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ঘটনাও। নির্বাচনের সময় নগদ প্রবাহ বাড়ে, গ্রামীণ বাজার সচল হয় ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হয়। একইসঙ্গে অবৈধ অর্থপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়ে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একদিকে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি সচল রাখা ও অন্যদিকে অনিয়ম ঠেকানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ভারসাম্যের একটি পরীক্ষাই বলা যায়।
নির্বাচন শেষে অর্থপ্রবাহ আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের।
ব্যাংক বন্ধ, এটিএমে নির্ভরতা
১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি, এরপর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা চার দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে এটিএমে পর্যাপ্ত নগদ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, টানা ছুটিতে কিছু এলাকায় এটিএমে নগদ সংকট দেখা দিতে পারে।
ভোট কেনাবেচার অভিযোগ
নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট কেনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ উঠেছে, যা বগুড়ায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটিয়েছে।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং সংখ্যালঘু নারীদের মধ্যে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “কোথাও কোথাও নগদ টাকার পাশাপাশি বিরিয়ানি বিতরণের মাধ্যমে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
অপরদিকে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, “ইনসাফ ও সততার কথা বলে ভোট কেনার চেষ্টা চরম দ্বিচারিতার উদাহরণ।” মাহদী আমিনের অভিযোগ, ঢাকা-১৫ আসনে দলীয় প্রধানের পক্ষে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাইতে দলের একজন শীর্ষ নেতা ও আইনজীবী প্রকাশ্যে টাকা বিতরণ করেছেন এবং ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
পূর্বকোণ/আরআর/পারভেজ