
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর ও কৃষি প্রধান দেশ। গর্ব ও অহংকার করে বলা হতো, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। প্রবাদ ছিল ‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু’। সেই কৃষি এখন সংকটময় সন্ধিক্ষণে। জনসংখ্যার চাপে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে কমছে কৃষি জমি। এতে বাঙালির প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন বিপদসংকুলে পড়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করে খাদ্য-ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে।
নগরায়ণের দ্রুত প্রসার ঘটেছে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে। শহরের চাকচিক্যের ছোঁয়া লেগেছে শহরতলী এলাকায়। অথচ কৃষির প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে পল্লী এলাকা। কৃষি জমির ওপর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেছে আবাসস্থল, দালান-কোটা, শিল্প-কারখানাসহ নানা স্থাপনা। কৃৃষি জমি দ্রুত চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। এ থেকে বাদ পড়েনি সংরক্ষিত বনভূমি, সরকারি খাস জমি ও বালুচর ভূমিও। রক্ষা করা যাচ্ছে না পুকুর-জলাধারও।
তবে হতাশার মধ্যেও আশা জাগাচ্ছেন কৃষিবিজ্ঞানী ও ভাতো বাঙালির স্বপ্ন জিইয়ে রাখা এ মাটির বিজ্ঞানী খ্যাত কৃষকেরা। উন্নতজাতের বীজ আবিষ্কার-ব্যবহার, উন্নত প্রযুক্তি-আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে বাড়ছে ফসল উৎপাদন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, কৃষি উন্নতির কারণেই গত এক দশকে দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ৪৯ থেকে নেমে এসেছে ১০.৫ শতাংশে। চট্টগ্রামে কৃষি জমি কমার চিত্র ফুটে ওঠেছে কৃষি অধিদপ্তরের জরিপে। ১৯৯৭ সালে কৃষি জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর। ২০১০ সালে জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ২৩৫ হেক্টরে। ২০২৫ সালে ফসলি জমির পরিমাণ চার লাখ চার হাজার ১২ হেক্টর। এরমধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দুই লাখ ৩১ হাজার ৩২১ হেক্টর। ফসলি জমির পরিমাণ দুই লাখ ১০ হাজার ২৯২ হেক্টর। এই জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিন দশকের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার কৃষি আবাদি জমি কমেছে।
দ্রুত শিল্পায়নের প্রভাব :
চট্টগ্রামকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী। সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বাণিজ্য-বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার ঘটেছে। দ্রুত উত্থান হয়েছে শিল্পায়নের। শহরাঞ্চল ছাপিয়ে গ্রামাঞ্চলেও ঢুকেছে সারি সারি শিল্প-কারখানা। গ্রামাঞ্চলে কৃষি জমির ওপর গড়ে ওঠেছে শিল্প-কারখানা। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে কৃষিতে।
দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে নদী-খাল তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠেছে বেশির ভাগ শিল্প-কারখানা। এতে নদী-খালের জায়গা দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। শিল্পায়নের গ্রাসে অনেক খাল সংকুচিত ও মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে চাষাবাদে পানি সংকটে অনাবাদী পড়ে থাকে শত শত একর জমি।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিভাগওয়ারি কৃষি জমি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। এ বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
নজর নেই কৃষি জমি সুরক্ষায় :
বাংলাদেশে কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, কৃষি জমি কৃষি কাজেই ব্যবহার করতে হবে। কৃষি জমি নষ্ট করে আবাসন-ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু পরিতাপে বিষয়, আইনটি পাস হয়নি। আইনটি পাস করার উদ্যোগ নিয়ে বর্তমান সরকার।
কৃষি অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ইটভাটা, কলকারখানা, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে প্রতি বছর এক শতাংশ হারে আবাদী জমি কমে যাচ্ছে। ধান আবাদ কমে এসেছে।
বাংলাদেশে কৃষি জমি সুরক্ষায় নজর না দেওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার না করার কারণে কৃষি জমি দ্রুত অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোতে পরিকল্পিতভাবে জমির ব্যবহার করা হয়। এমনকি পাশের দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষক ছাড়া অন্য কেউ কৃষিজমি কিনতে পারে না। কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও হিমাচলে কৃষকরাই কেবল কৃষিকাজের জন্য কৃষিজমি কিনতে পারে। হরিয়ানায় কৃষিজমির এলাকাকে নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা আছে। সেখানে জমি কিনে কৃষিকাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে গেলে সরকারের অনুমতি লাগে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির এক-চতুর্থাংশই হুমকির মুখে।
পেশার বাঁক বদল :
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে কমছে আবাদি জমি। এরমধ্যে কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। দুই সংকটে পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন কৃষিশ্রমিকেরা। পেশার বাঁক বদলে কৃষিশ্রমিকের অভাব দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষিনির্ভর ছিল। চট্টগ্রামে কমছে কৃষিনির্ভর পেশা। জেলায় কৃষিক্ষেত্রে কাজ করা জনসংখ্যার পরিমাণ ১৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এর বিপরীতে শিল্পখাতে ২৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সেবাখাতে ৫৩ দশমিক ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা জড়িত।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের তথ্যমতে, কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৩টি। প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা দুই লাখ ৫৪ হাজার ৬৩১ জন। ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা এক লাখ ৬২ হাজার ৯১ জন। মাঝারি কৃষকের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫১০ জন। বড় কৃষকের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৫০ জন। ১০ টাকার ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে এক লাখ ৮ হাজার ৪৭০ জনের।
খাদ্য ঘাটতি :
চট্টগ্রামে মোট খাদ্য চাহিদা ১৬ লাখ ১২ হাজার ৮১৬ মেট্রিক টন। খাদ্য উৎপাদন ৮ লাখ ৬৪ হাজার ২০৪ মে. টন। অপচয় বাদে প্রকৃত খাদ্য উৎপাদন ৭ লাখ ৬৪ হাজার ১২৯ টন। খাদ্য ঘাটতি রয়েছে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন। আমদানি বা অন্য জেলা থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে চট্টগ্রামের সংকট মেটাতে হয়।
ধান উৎপাদনের চিত্র :
চট্টগ্রামের ধান উৎপাদনের গত ১০ বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ মৌসুমে দুই লাখ ৮৬ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আউশ, আমন ও বোরো আবাদ হয়। ফসল উৎপাদন হয় ৫ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৫ মে. টন। ২০১৫-১৬ সালে দুই লাখ ৬২ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়। উৎপাদন হয় সাত লাখ ৩৮ হাজার ৩৭১ মে. টন। ২০১৮-১৯ সালে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৪৬৫ হেক্টরে ধান উৎপাদন হয় আট লাখ ৩৮ হাজার ৭৪ টন। ৫ বছরে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ উঠা-নামা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ক্রমাগত বেড়েছে।
উৎপাদন খরচ ও বেচাকেনা :
কৃষকদের অভিযোগ, ধান চাষে মেলাতে পারছেন না উৎপাদন খরচের হিসাব। সার-সেচসহ কৃষির সব উপকরণে টানতে হচ্ছে বাড়তি খরচের বোঝা। এ কারণে মৌসুমের শুরুতেই দুশ্চিন্তা দেখা দেয় কৃষকের ঘরে ঘরে। প্রান্তিক ও মাঠ পর্যায়ের কৃষকেরা তখন এনজিও সংগঠনের ঋণের জালে আটকে পড়েন। উৎপাদিত ধান বেচে খরচ তুলতে না পারার ঘোরে আছেন কৃষকেরা। তবে কৃষি খরচের কথা চিন্তা করে প্রতিবছর ধান-চালের দাম বাড়াচ্ছে সরকার।
সময়ের সঙ্গে পাল্টে চলেছে পৃথিবী। কৃষির বিবর্তনে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিকৌশল নিয়ে গবেষণা ও যান্ত্রিক উৎকর্ষে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে উন্নত দেশগুলো। আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশও বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর। কৃষকের উন্নয়ন মানে বাংলাদেশের উন্নয়ন। কৃষির জয় মানে বাংলাদেশের জয়।
পূর্বকোণ/ইবনুর