
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের রাতের ঘুম ‘হারাম’ হয়ে গেছে। দিন-রাত প্রচারণায় মাঠ-ঘাট, চায়ের দোকান, অফিস আদালত, পাড়া-মহল্লা সরগরম করে তুলেছেন তারা। সবার আলোচনায় একটাই প্রশ্ন- কে হচ্ছেন উপক‚লীয় জনপদ বাঁশখালীর আগামী দিনের সংসদ সদস্য।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- নির্বাচনে অংশ নেয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত এবং বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হতে পারে। আর ভোটের মাঠে জিততে মূল ফ্যাক্টর হতে পারেন এই আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নীরব ভোট এবং সংখ্যালঘু ভোটাররা।
বাঁশখালী থেকে এবার বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর সন্তান ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আ্হ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মীর দাবি এই আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অতীতে ৫ বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। শেষ হাসি বাপ্পাই হাসবেন।
অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম আগে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মুখ। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন- এই পরিচিতি কাজে লাগিয়ে এবার জহিরুলকে সংসদে পাঠাতে চান তারা। এ জন্য তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে ভোটারদের কাছে টানতে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী ছাড়াও এবার নির্বাচনে আলোচনায় আছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা লেয়াকত আলী। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তার সমর্থক হিসেবে পরিচিত- সাবেক ইউপি সদস্য আলী নবী বলেন, ‘লেয়াকত আলীর পক্ষে মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তাকে জয়ী করতে সাধারণ ভোটাররাও কাজ করছেন।’
বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে চট্টগ্রাম-১৬ আসন গঠিত। পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর পূর্বে পাহাড় বেষ্টিত এই জনপদ মাছ, লবণ, ধান, লিচুর জন্য প্রসিদ্ধ। তবে বাঁশখালীর দুঃখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও প্রধান সড়ক। তাই নির্বাচনে এই দুই সমস্যা সমাধান নিয়েই আলোচনা হচ্ছে বেশি। এ বিষয়ে প্রার্থীরাও নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, ‘গণঅভুথ্যান ও আন্দোলন পরবর্তী বাঁশখালীর গণমানুষের মুখে হাসি ফোটাতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। এলাকার লোকজনের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জয়ী হলে এলাকার উন্নয়নই হবে আমার প্রধান কাজ।’
তিনি বলেন, ‘বাঁশখালীর প্রধান সড়ক ও উপকূলে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য আমার পরিকল্পনা আছে। ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বেকার ভাতার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবো। বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করাই আমার মূল উদ্দেশ্য।’
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জয়ী হলে প্রথমে এবিসি সড়কের উন্নয়ন কাজ এবং স্থায়ী বেঁড়িবাধ নির্মাণে কাজ শুরু করবো। এছাড়া জলকদর খালের উভয় পাশে বাঁধ নির্মাণের জন্য ডিপিপি তৈরি করে জমা দেয়া হয়েছে। এই কাজ এগিয়ে নেবো। শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সব ধরনের কাজ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাঁশখালীতে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে। এটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট করা হবে। তরুণ ভোটারদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করব। আইটি এক্সপার্ট দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। মাস্টার ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করব। নতুন বাঁশখালী বিনির্মাণে স্বচ্ছতা ও সততার মাধ্যমে দালালমুক্ত প্রশাসন, দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখানো হবে।’
উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী লিয়াকত আলী বলেন, ‘উপকূলবাসীর দুঃখের কথা আমি সবচেয়ে বেশি বুঝি। উপকূলবাসীকে রক্ষার জন্য স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং প্রধান সড়কটি ৪ লেইন বিশিষ্ট করাই হবে আমার প্রধান কাজ। এছাড়া গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাব।’
এই তিন ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী ছাড়াও চট্টগ্রাম-১৬ আসন থেকে এবার নির্বাচনে লড়ছেন- ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মালেক আশরাফী (চেয়ার), গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হক তায়েফ (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রুহুল্লাহ তালুকদার (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী এহছানুল হক (হারিকেন)।
এরমধ্যে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ রুহুল্লাহ বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নকেই আমি গুরুত্বসহকারে দেখছি। প্রধান সড়কের যানজট নিরসন, প্রধান সড়ক চার লেইন করণ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, আলেম-উলামাদের চাকরি নিশ্চিতকরণে আমি কাজ করবো।’
চেয়ার প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল মালেক আশরাফী, ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী আরিফুল হক তায়েফ এবং হারিকেন প্রতীকের প্রার্থী এহছানুল হকও তাদের ইশতিহারে এলাকার উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, বাঁশখালীতে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১১ হাজার ২৭৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮২ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৯১ হাজার ২৮৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার ৫ জন। ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১১২টি এবং ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭২০টি।
বাঁশখালী থানার ওসি খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব ভোট কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ মাঠে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে যাতে ভোট প্রদান করতে পারে সেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।’
নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনিকভাবে সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামশেদুল আলমও।
পূর্বকোণ/পিআর