চট্টগ্রাম শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

লড়াই হবে ত্রিমুখী

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসন

লড়াই হবে ত্রিমুখী

মোহাম্মদ আলী ও সুমন শাহ

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) সংসদীয় আসন দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনের রাজনৈতিক মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এবার প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর সুন্নি জোট। মাঠ পর্যায়ে অন্যান্য দলের প্রার্থীদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ছে।

 

আনোয়ারা-কর্ণফুলীর উন্নয়নের সূচনা ঘটে বিএনপি সরকারের আমলে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু স্থাপনের মাধ্যমে। এই সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের যোগাযোগে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় শিল্পকারখানা, বন্দর কেন্দ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনে বিএনপির প্রভাব বলয় দৃঢ় রয়েছে।

 

বর্তমানে আনোয়ারা-কর্ণফুলী দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর ভাঙন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব দুই উপজেলার মানুষের প্রধান ভোগান্তির অন্যতম কারণ।

 

এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন মোট ৭ প্রার্থী। তারা হলেন, বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান চৌধুরী (দাঁড়িপাল্লা), সুন্নি জোটের ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান (মোমবাতি), গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মোহাম্মদ এমরান (সিংহ), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মু. রেজাউল মোস্তফা (আপেল), জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী (লাঙ্গল) ও গণঅধিকার পরিষদের মো. মুজিবুর রহমান (ট্রাক)।

 

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে এবার ভোটের লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও সমীকরণ। বিএনপির ঐতিহ্যবাহী প্রভাবের বিপরীতে ইসলামী দল ও জোটের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে সেদিকেই থাকিয়ে স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক নেতারা।

 

বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালে আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকায় বহু শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছি। ভবিষ্যতে আবার ক্ষমতায় এলে তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে এবং দুই উপজেলাকে চট্টগ্রামের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করা হবে।’

 

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তরুণ-যুবকদের রক্তের বিনিময়েই আজ এই নির্বাচন ও স্বাধীন পরিবেশ এসেছে। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে জুলাইয়ের চেতনায় তরুণদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

 

বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী মাওলানা এস এম শাহজাহান পূর্বকোণকে বলেন, ‘আনোয়ারা-কর্ণফুলীর বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, দেয়াঙ পাহাড়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমার প্রধান লক্ষ্য।’

 

চট্টগ্রাম-১৩ আসনে মোট ১৬টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারা উপজেলায় ১১টি এবং কর্ণফুলী উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত। মোট ভোটার তিন লাখ ৯৫ হাজার ২৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৭ হাজার ৭১৪ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৮৭ হাজার ৫৩২ জন। মোট কেন্দ্র ১১৮টি এবং ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭৯০টি।

 

পরিসংখ্যান মতে, ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ ইদ্রিছ বিকম। ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। এই নির্বাচনের তিন বছরের মধ্যে ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হন জাসদের আ স ম আবদুর রব এর নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বিরোধীদলের মোখতার আহমেদ। একই আসনে ১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম। একই বছর ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও জয়লাভ করেন তিনি। এরপর ২০০১ সালে পহেলা অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। ২০১২ সালে তিনি ইন্তেকাল করলে শূন্য আসনে উপ-নির্বাচন করা হয়। ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু’র জ্যেষ্ঠ সন্তান আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। ওই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তবে ওই নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করেনি।  এরপর ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তবে ওই নির্বাচনেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায় ভোট বর্জন করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।

 

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট