
গত ৪ ফেব্রুয়ারি নানা আয়োজনে পালিত হলো বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। বাংলাদেশে প্রতিবছর এই দিনটি পালন করা হয়। বাংলাদেশে ক্যান্সার একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২,৫০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়। তবে জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় এই সংখ্যা সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। উদাহরণ হিসেবে স্তন ক্যান্সারের কথা বলা যায়- প্রতিবছর প্রায় ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ নতুন স্তন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয় বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকার কারণে সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।
চট্টগ্রামে সামগ্রিকভাবে ক্যান্সার চিকিৎসার সুবিধা খুবই সীমিত। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি সরকারি হাসপাতালে কোবাল্ট মেশিনসহ একটি রেডিওথেরাপি বিভাগ রয়েছে, যেখানে মেডিক্যাল অনকোলজির সেবাও একই সঙ্গে দেওয়া হয়। আধুনিক বিশ্বে ক্যান্সার চিকিৎসা একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ক্যান্সার চিকিৎসায় বিভিন্ন সাব-স্পেশালিটির স্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে। যেমন-রক্তজনিত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হেমাটোলজিস্টই উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ; কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির জন্য মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট; এবং প্রাথমিক বা সহায়ক (অ্যাডজুভ্যান্ট) চিকিৎসা হিসেবে রেডিয়েশন প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তত ৬০% ক্যান্সার রোগীর জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিয়েশন থেরাপির প্রয়োজন হয়।
এছাড়াও সার্জিকাল অনকোলজিস্ট ও গাইনোকোলজিস্টের ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমে রেডিওলজি ও প্যাথোলজি বিভাগের ভ‚মিকা অপরিসীম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সরকারি খাতে প্যাথোলজি বিভাগ পর্যাপ্তভাবে সজ্জিত নয়। রেডিওলজি বিভাগেও ব্যাপক উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে সেখানে কোনো ইএমআর (ঊগজ) বা প্যাকস (চঅঈঝ) সিস্টেম নেই। প্যাকস অর্থ পিকচার আর্কাইভিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেম, যা আধুনিক রেডিওলজির জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। একইভাবে প্যাথোলজি বিভাগে ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি ও নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS) সুবিধা থাকা প্রয়োজন, যা বর্তমানে নেই।
বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সার ব্যবস্থাপনার কথা চিন্তা করলে আমাদের একটি সমন্বিত ও উন্নত স্তন ক্যান্সার কেয়ার প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি। এই প্রোগ্রামটি মূলত একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের মাধ্যমে এক ছাদের নিচে (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) রোগীদের সেবা প্রদান করবে। স্তন ক্যান্সার ব্যবস্থাপনায় দুটি প্রধান অংশ রয়েছেÑপ্রতিরোধ ও চিকিৎসা। প্রতিরোধের জন্য একটি কার্যকর স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম প্রয়োজন। স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের স্বর্ণমান হলো ম্যামোগ্রাম। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র একটি ম্যামোগ্রাম মেশিন রয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে আমার মনে হয়, বাংলাদেশকে অন্তত স্তন ক্যান্সারের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারই সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রথমেই আমাদের একটি জাতীয় বেস্ট ক্যান্সার কেয়ার প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস থাকতে হবে, যেখানে রেডিওলজিস্ট, প্যাথোলজিস্ট, ব্রেস্ট সার্জন, মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট নিয়ে একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম কাজ করবে। এই টিমের সমন্বয়ের জন্য একজন কোঅর্ডিনেটর বা নার্স ন্যাভিগেটর থাকা অত্যন্ত জরুরি, যিনি পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় টিমের সকল সদস্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি-এই দুই স্তরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারসহ ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা উচিত। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতেও নিজস্ব ওয়ান-স্টপ ক্যান্সার কেয়ার সার্ভিস থাকতে পারে, যেখানে খরচ মাঝারি পর্যায়ে থাকবে। পাশাপাশি সম্পূর্ণ বেসরকারি ক্লিনিকগুলোও তাদের নিজস্ব স্তন ক্যান্সার কেয়ার প্রোগ্রাম চালু করতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন জাতীয় স্তন ক্যান্সার কেয়ার প্রোগ্রাম ও প্রটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হতে হবে। এভাবেই আমরা একটি কার্যকর জাতীয় ক্যান্সার কেয়ার প্রোগ্রাম গড়ে তুলতে পারব।
একইসঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি জাতীয় ক্যান্সার কেয়ার ফান্ড গঠন করা জরুরি। এই ফান্ড থেকে রোগীদের চিকিৎসার খরচ বহন করা হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক মাসে ন্যূনতম ১০ থেকে ২০ টাকা করে এই ফান্ডে অবদান রাখতে পারেন। সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ফান্ড পরিচালনা করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসা সবার জন্য আরও সহজলভ্য ও সহনীয় করা সম্ভব হবে।
ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।