
চট্টগ্রামের ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম-৯। কোতোয়ালী ও বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসন। দেশের সব রাজনৈতিক দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আসনটি। এ কারণে নির্বাচন আসলে নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সব দলই আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রার্থীরা দিন-রাত এক করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন অলিগলি ও আবাসিক এলাকা, হাট-বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। প্রার্থী ছাড়াও প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আলাদা দল বেঁধে পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সমান্তরালে করছেন পথসভাও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-৯ (বাকলিয়া-কোতোয়ালী) আসনে মোট প্রার্থী ১০ জন। এরা হলেন বিএনপির মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর ডা. এ কে এম ফজলুল হক (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামিক ফ্রন্টের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ (চেয়ার), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুস শুক্কুর (হাতপাখা), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন (আপেল), জনতার দলের মো. হায়দার আলী চৌধুরী (কলম), গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ (মাথাল), নাগরিক ঐক্যের মো. নুরুল আবছার মজুমদার (কেটলি), সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) মো. শফি উদ্দিন কবির (কাঁচি) ও জাতীয় সামজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আবদুল মোমেন চৌধুরী (তারা)।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-৯ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে এবার আটঘাঁট বেঁধে মাঠে নেমেছে বিএনপি। পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীও। তারাও কোমর বেঁধে মাঠে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ভোটের জন্য যাচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। এ আসনে জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে চায় জামায়াত। এ কারণে ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচনী মাঠে ততোই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত ছাড়াও অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন ডোর-টু ডোর।
চট্টগ্রাম-৯ আসনে নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রশ্নে বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান পূর্বকোণকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন, মাদক-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ইভটিজিং প্রতিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।’
এ আসনে সমস্যাগুলো প্রসঙ্গে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্ন শহর, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের অভাব, যানজট, হকার, ফুটপাত দখল, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ইভটিজিংসহ নানা সমস্যা রয়েছে। বাকলিয়া-কোতোয়ালীতে জলাবদ্ধতা একটা বিশাল সমস্যা, সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায়। চাক্তাই খালের খনন হলেও মানুষ এখনো ময়লা ফেলে খালে। মানুষের এই অভ্যাসগত পরিবর্তন জরুরি।’
আবু সুফিয়ান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব। ঘনবসতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষগুলোর স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের অভাব রয়েছে। অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নেই। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে গেলে সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা যাতে নিশ্চিত করা যায় সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়াও মাদক, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নীরব চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনাও আছে। নির্বাচিত হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এই সমস্যাগুলো সমাধান এবং মানুষকে একটি স্বাভাবিক সুন্দর সুস্থ জীবন যাপনের ধারা উপহার দিব।
একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হক দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে পূর্বকোণকে বলেন, ‘দীর্ঘ ৫৪ বছরেও অবহেলিত থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদকে আধুনিকায়নে রাস্তাঘাট সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং হকার পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শহর নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের যাত্রা চট্টগ্রাম-৯ থেকেই শুরু হবে।’
এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরি নয়, যুবকরা হবে উদ্যোক্তা’-এই লক্ষ্যে তিনি কারিগরি ও আইটি শিক্ষার প্রসার, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণ প্রদান এবং ব্যবসার প্রথম তিনবছর গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল মওকুফের মতো বৈপ্লবিক পরিকল্পনার কথা জানান। এছাড়াও ফ্রিল্যান্সিং ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যুবকদের নৈতিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
ডা. এ কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘কৃষি, শিল্প, মৎস্যসহ উৎপাদনশীল প্রতিটি খাতে যুবকদের সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিদেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।’
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-৯ (বাকলিয়া-কোতোয়ালী) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৩ হাজার ৯০৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৪৪৮ জন। হিজরা ভোটার রয়েছে ৯জন। মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১২১টি এবং ভোট কক্ষ ৭৭৮টি।
স্বাধীনতার পর ১২টি জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসনে মূলত বিএনপি, আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও জাতীয়পার্টি এ তিন রাজনৈতিক দলেরই প্রাধান্য ছিল। এ আসনে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, জাতীয়পার্টি তিনবার এবং বিএনপি জিতেছে চারবার। এখানকার রাজনৈতিক মাঠে একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচলন আছে যে, এ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করেন, সেই দলই সরকার গঠন করে। বিগত বেশিরভাগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমনটি ঘটেছে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। শুধু সরকার গঠন নয়, এ আসনে জয়ী হয়ে বেশিরভাগ প্রার্থী হয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যও।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন আওয়ামী লীগের জহুর আহমেদ চৌধুরী। তখন সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভের পর জহুর আহমেদ চৌধুরী তৎকালীন মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য, পরিবার ও পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হন। এরপর ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়লাভ করেন বিএনপির অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দিন। নির্বাচনে তখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দিন বিএনপির মন্ত্রিসভায় উপ-মন্ত্রী হন। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়পার্টির সেকান্দর হোসেন মিয়া জয়লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জাতীয়পার্টি থেকে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান। নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপির মন্ত্রিসভায় স্থান পান তিনি। সরকারের বন ও পরিবেশ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান আবদুল্লাহ আল নোমান। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী। ওই নির্বাচনে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান জয়লাভ করেন। সেবারও তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভায় স্থান পান। কিন্তু বিরোধীদল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় থাকায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ওই সরকার। ভেঙে দেওয়া হয় সংসদ। পরবর্তীতে একই বছর ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান। নির্বাচনে জয়লাভের পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ওই মন্ত্রিসভায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এম এ মান্নান। ২০০১ সালে পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী হন আবদুল্লাহ আল নোমান। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি। নিকটতম প্রার্থী ছিলেন বিএনপির মো.সামসুল আলম। একই দলের আবদুল্লাহ আল নোমান সেবার এ আসন থেকে নির্বাচন করেননি। তিনি চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলি, ডবলমুরিং, খুলশী, হালিশহর ও পাঁচলাইশ) আসনে নির্বাচন করেন। ওই সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধীদল অংশগ্রহণ করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধীদল নির্বাচন বর্জন করে। ওই সময়ে এ আসনটি জাতীয়পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনে জাতীয়পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেকমন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জয়লাভ করেন। একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এরপর ২০২৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করায় ভোট বর্জন করে বিএনপি ও জামায়াত। ওইবছর ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
পূর্বকোণ/ইবনুর