
বেড়ানোর জন্য বাংলাদেশে বহু সুন্দর সুন্দর জায়গা রয়েছে, যা শুধু দেশের পর্যটকদের নয়, বিদেশি পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। তেমনি একটি অপরূপ মনভোলানো জায়গা হল বাংলাদেশের সুন্দরবন। আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪তম ব্যাচের কয়েকজন বন্ধু পরিবারের সদস্যসহ সুন্দরবন বেড়াতে গিয়েছিলাম। এর জন্য আমরা একটা ট্যুরিজম কোম্পানির সাথে কথা বলে চট্টগ্রাম শহর থেকে এসি বাসে খুলনা যাওয়া আসা, সুন্দরবনে ৩ দিন ২ রাত বেড়ানোর প্যাকেজটা ঠিক করি। এরজন্য খরচ দিতে হল জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা। তবে ঐ প্যাকেজের বাইরে আমরা সুন্দরবন থেকে এসে খুলনায় নিজ খরচে একরাত ও একদিন থাকব এবং খুলনা শহর ও বাগেরহাট বেড়ানোর পর চট্টগ্রাম ফিরব এমন সিদ্ধান্ত নিলাম।
যথারীতি যাবার সব প্রস্তুতি নিয়ে রাতের দিকে আমরা এসি বাসযোগে চট্টগ্রাম শহর থেকে খুলনার পথে যাত্রা করি। পথে দুবার যাত্রা বিরতীর পরেরদিন সকাল পৌনে ১০টার দিকে আমরা খুলনা জেলঘাটে পৌঁছলে জাহাজের অপেক্ষারত লোকজন আমাদেরকে লাগেজসহ ইঞ্জিল চালিত বোটে করে জাহাজে নিয়ে যায়। আমাদের জাহাজের নাম বেঙ্গল এডভেঞ্চার। মাঝারি হলেও জাহাজটি সুন্দর পরিপাটি বেশ গুছানো। জাহাজে উঠতেই ফুল ও ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস দিয়ে আমাদের স্বাগত জানাল। এরপর আমরা যার যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে জাহাজের ছাদে তাদের ডাইনিং স্পেসে ব্রেকফাস্ট সারলাম। ততক্ষণে আমাদের জাহাজ ভৈরব নদীর কুল ঘেঁষে দুধারের অপরূপ সৌন্দর্য ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে নদীর কলকল স্রোতের ঢেউ মাড়িয়ে সুন্দরবনের পথে যাত্রা করেছে। তখন সবার মনের ভিতর অন্যরকম এক ভালোলাগার অনুভ‚তি জেগে উঠে। শুরু হয় নানা ভঙ্গিমায় যতশত পোজে ছবি তোলার এক দারুণ উৎসাহ উদ্দীপনা।
সুন্দরবনের বিভিন্ন স্পট দেখানোর লক্ষ্যে জাহাজগুলোকে বেশ কয়েকটি নদী দিয়ে চলাচল করতে হয়। তার মধ্যে ভৈরব, রূপসা, পরশু, শেউলা, কুঙা, মরাপশু ইত্যাদি। জাহাজ বেঙ্গল এডভেঞ্চারে এটাসবাথসহ আমাদের থাকার রুমগুলো বেশ ভালই ছিল। দুইবেলা চা নাস্তা ও দুইবেলা ভাতের হরেকরকম আইটেম বেশ মজাজার ও পছন্দনীয় ছিল, যার কোন তুলনা ছিল না। জাহাজের ছাদে পূর্ণিমা চাঁদের জ্যোৎস্নার বাধভাঙা আলোয় রাতের বেলায় আড্ডাবাজি, গানবাজনা, গল্পগুজব, হাসিঠাট্টায় আনন্দের হাড়ি যেন লুটিয়ে পড়ছিল। কেউ কেউ আবার তাসখেলায় মগ্ন। নিরাপত্তার স্বার্থে বনবিভাগের দুইজন অস্ত্রধারী রক্ষী সার্বক্ষণিক জাহাজে এবং বেড়ানোর সময় স্পষ্টগুলোতে সঙ্গে থাকেন।
সুন্দরবন বেড়ানোর উপযুক্ত সময় নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস। এই সময় প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০টা জাহাজ পর্যটকদের নিয়ে সুন্দরবনে যায়। আপনি চাইলে একা, পরিবারসহ বা গ্রুপ করে সুন্দরবন বেড়াতে পারেন। একটি আস্থাশীল ট্রাভেল এন্ড টুরিজম কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে ট্যুর প্যাকেজ ঠিক করতে পারেন। আমাদের গ্রুপে আমরা পরিবারসহ ৩৯ জন ছিলাম এবং পুরো ননএসি জাহাজটা আমাদের জন্য রিজার্ভ করা ছিল। ফলে বাড়তি আনন্দে জাহাজের ভিতর মনে হয়েছিল নিজেদের ঘরসংসার। পর্যটকদের জন্য রয়েছে ছোট-বড় ও মাঝারি এসি ননএসি জাহাজ। তবে শীতকালে নন এসি জাহাজে কোন সমস্যা হয় না। প্রতিদিন ভোরে এবং অপরাহ্নে দুবার করে জাহাজ থেকে যাত্রীদের বোটে করে বিভিন্ন স্পটে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন নিরাপত্তার রক্ষী ও জাহাজের দুইজন গাইড সঙ্গে থাকেন।
ভোর বেলায় কখনো ব্রেকফাস্টের আগে আবার কখনো ব্রেকফাস্টের পর স্পটগুলো দেখানো হয়। দুপুরে ফিরে এসে লাঞ্চের পর পুনরায় অন্য স্পট দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের ডিনারের পর শুরু হয় নাচ গান ও আনন্দ আড্ডা। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, বিকালের নাস্তা, ডিনার সবই জাহাজের ছাদে ডাইনিং স্পেজে দেয়া হয়। মনে রাখতে হবে, যাবার সময় প্রয়োজনীয় ও জরুরি ঔষধ, গরম কাপড়চোপড় ও ব্যবহারের জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হবে।
সুন্দরবনে বেড়ানোর স্পট অনেক। তাই অনর্থক সময় নষ্ট না করে চেষ্টা করতে হবে অধিকাংশ স্পষ্ট দেখার,এমন প্রস্তুতি সবসময় মাথায় রাখতে হবে।
আমাদের ৩ দিন ও ২ রাতের প্যাকেজে সুন্দরবনের আকর্ষণীয় স্পষ্টের মধ্যে হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম, আন্দারমানিক, কটকা সমুদ্রসৈকত, জামতলা সীবিচ, টাইগার টিলা, হিরণ পয়েন্ট, নীলকমল, দুবলার চর, করমজল আরো কয়েকটি পয়েন্ট দেখার সুযোগ হয়। সুন্দরবন দেখার জন্য খরচের বাজেটটা মাথায় রেখে শারীরিক একটু সুস্থতা এবং মনোবল ঠিক থাকলেই চলে। জীবনে একবার হলেও সুন্দরবন বেড়িয়ে আসুন। সুন্দরবন যেতে হলে প্রথমে খুলনা যেতে হবে এবং সেখানে জেলঘাট থেকেই জাহাজে উঠতে হয়।
সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের অংশ। বিস্তীর্ণ বৃহৎ বনভ‚মি ও জলাভ‚মিতে এই সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এর আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। যা বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথভাবে অবস্থিত। তবে বৃহৎ অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬৫১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে পড়েছে। বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার অংশ নিয়েই সুন্দরবন। সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অভ্যয়ারন্য। বন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ, ৫৩০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৫৫ প্রজাতির পাখি, ৪৭৫১৫ টি বন্যশুয়োর, ২৫ হাজার গুইসাপ, ১৪০ টির মত কুমির, ১ লাখ ৪০ হাজার চিত্রা ও মায়া হরিণ, ১লাখ ৫৫ হাজারের মত বানর, ৯০ প্রজাতির সাপ, ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১২৫০০ সজারু, ৫০০টি ডলফিন ও বহু প্রজাতির মাছ রয়েছে।
সুন্দরবনে রাতের বেলায় নোঙর করা আলো ঝলমল জাহাজগুলোকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। মনে হয় কোন এক বন্দরে জাহাজগুলো নোঙর করা আছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সন্ধিৎসু পর্যটক; সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।