চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

জয়লাভের হাতিয়ার ৩ ফ্যাক্টর

জয়লাভের হাতিয়ার ৩ ফ্যাক্টর

মোহাম্মদ আলী ও এস এম মোরশেদ মুন্না

২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৫:১০ অপরাহ্ণ

ঋণখেলাপি ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করে দিলে অনেকটা টেনশনে পড়ে যান প্রার্থী ও দলের নেতাকর্মীরা। তাতে এ আসনে দলটির প্রচার-প্রচারণায় ছেদ পড়ে। পরে সরোয়ার আলমগীর আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে ফেলে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। তাই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিরামহীন প্রচারণা চলছে বিএনপির। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অন্য প্রার্থীরাও।

নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসনে এবারে মাঠের লড়াইয়ে আছেন আট প্রার্থী। তারা হলেন- বিএনপির সরোয়ার আলমগীর (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভান্ডারী (একতারা), গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম (ট্রাক), জনতা পার্টির গোলাম নওশের আলী (কলম), স্বতন্ত্র প্রার্থী আহমদ কবির করিম (ফুটবল), আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আরা (হরিণ) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জুলফিকার আলী মান্নান (হাতপাখা)। বর্তমানে বেশিভাগ প্রার্থীই মাঠে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্তসময় অতিবাহিত করছেন; যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও।

পরিসংখ্যান মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসনে ১৯৭৩ সালে নুরুল আলম চৌধুরী (আওয়ামী লীগ), ১৯৭৯ সালে জামাল উদ্দিন আহমেদ (বিএনপি), ১৯৮৬ সালে নুরুল আলম চৌধুরী (আওয়ামী লীগ), ১৯৮৮ সালে মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী (জাসদ), ১৯৯১ সালে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (আওয়ামী লীগ), ১৯৯৬ সালে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (বিএনপি), ১৯৯৬ সালে রফিকুল আনোয়ার (আওয়ামী লীগ), ২০০১ সালে রফিকুল আনোয়ার (আওয়ামী লীগ), ২০০৮ সালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপি), ২০১৪ সালে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (মহাজোট), ২০১৮ সালে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (মহাজোট) ও ২০২৪ সালে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি (আওয়ামী লীগ) বিজয়ী হন। আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন আটবার, বিএনপি তিনবার ও জাসদ একবার।

 

দুই পৌরসভা ও ১৮ ইউনিয়ন নিয়ে ফটিকছড়ি আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ১৯৭ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ২৯ হাজার ২৬৭ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন একজন। মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৪০টি। নির্বাচনী প্রচারণায় ফটিকছড়ি আসনের প্রার্থীরা এলাকার অনুন্নত রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সংকট নিরসনে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

 

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ফটিকছড়ি। ৭৭৩ বর্গকিলোমিটারের এ উপজেলার দক্ষিণে রাউজানের নোয়াজিষপুর ও হলদিয়া ইউনিয়ন সীমান্ত এবং উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। বিশাল এ উপজেলা কৃষি, মৎস্য, চা-শিল্পের জন্য যেমন উর্বর, তেমনি ধর্মীয় স্থাপনা, পুরাতন স্থাপত্য ও অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীর পীঠস্থান হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত। এ উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। স্রোতধারা এ নদীর পানি ব্যবহার করে একদিকে কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে ফসল ফলিয়ে উপকৃত হলেও অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে নদীর দুই তীরের ভাঙনে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হন অনেকে। তাই হালদা নদীর ভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতিও নির্বাচনে একটি কার্যকর ইস্যুতে পরিণত হয়। অতীতে নির্বাচনের সময়ে নদীভাঙনরোধে আশ্বাস মিললেও নির্বাচনের পর তা অনেকটা অবহেলায় পরিণত হয়। তাতে দুঃখ বাড়ে নদীর পাড়ে বাসিন্দাদের। কিন্তু এবার এটি নিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে জোরালো প্রতিশ্রুতি চান স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

স্থানীয় ভোটাররা জানান, ফটিকছড়ি উপজেলায় অতীতের নির্বাচনগুলোর পরিবেশ তেমন একটা সুখকর ছিল না। কেন্দ্র দখল, প্রতিপক্ষের উপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ কারণে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন অনেকে।

 

ফটিকছড়ি উপজেলার মোট ভোটারের বড় একটি অংশ নারী। নারী ভোটারদের প্রত্যাশা- নির্বাচনে নারীসহ সাধারণ মানুষ যেন কোন ভয়ভীতি ছাড়া নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। তারা এমন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চান, যারা নারীদের দেশের উন্নয়নের সমান অংশীদার হিসেবে গণ্য করবে। নারীরা ঘরে-বাইরে এবং কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে।

 

জানতে চাইলে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর পূর্বকোণকে বলেন, দীর্ঘসময় পর মানুষ আবার গণতন্ত্রের সুফল পাওয়ার আশায় উন্মুখ হয়ে আছে। মানুষ নির্বাচন নিয়ে উৎসাহী। তারপরও আড়ালে এক ধরনের আতঙ্কও বিরাজ করছে। একটি বিশেষ গোষ্ঠী নারী ও পুরুষদের আইডি কার্ড নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে ভয় আছে যে, আগের মতো এবারও ভোট কেটে নেওয়া হবে কিনা। লেলাং ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

তিনি বলেন, ফটিকছড়ির অনেক সমস্যা। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সব সমস্যার সমাধান হবে। আমার প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে ফটিকছড়িকে শিল্প জোন হিসেবে ঘোষণা করা। এই লক্ষ্যে কাজ করবো। পর্যায়ক্রমে উন্নয়নের দিকে এগুবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন পূর্বকোণকে বলেন, একসময় এই জনপদে নির্বাচনের নামে কেবল মেকানিজম আর দলীয় ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য দেখা যেতো, যেখানে সাধারণ ভোটারদের কোন অংশগ্রহণ ছিল না। অস্ত্রের ঝনঝনানি ও ক্যাডারভিত্তিক সন্ত্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। ফটিকছড়িতে সম্প্রতি জামায়াতকর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এটি অনেক কিছুই ইঙ্গিত করে। ফটিকছড়ির সমস্যার শেষ নেই। আমরা অগ্রাধিকারভিত্তিতে ফটিকছড়িতে উন্নয়ন করবো।

 

জানতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী এডভোকেট জিন্নাত আরা বলেন, আমি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। ভোটারদের বেশ সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ বিজয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

 

জনতা পার্টির প্রার্থী গোলাম নওশের আলী বলেন, প্রচার প্রচারণায় হুমকিধমকির শিকার হচ্ছি। তারপরও বসে নেই। ফটিকছড়িতে অতীতে উন্নয়ন হয়েছে। যেহেতু বড় উপজেলা সেহেতু সমস্যাও অনেক। এ উপজেলায় আরও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফটিকছড়ির আয়তন অনুপাতে উন্নয়ন হচ্ছে না। ফটিকছড়িতে আসনভিত্তিক নয়, আয়তন অনুপাতে বরাদ্দ আসতে হবে, আমি সেটিকে প্রধান সমস্যা বলে মনে করি।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট