চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

নির্বাচনের পর সংসদ ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে: আলী রীয়াজ

অনলাইন

২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের ১২টি নির্বাচনের মতো নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানান, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনা করবে, তবে পাশাপাশি ১৮০ দিন এটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

আলী রীয়াজ বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতে অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনের মতো নয়। কারণ, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-ভুত্থানের পটভূমিতে। যারা একে অতীতের মতো সাধারণ মনে করছেন, তারা ভুল করছেন। যদি রাজনীতির বিশ্লেষক ও দলগুলো এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বুঝতে না পারে, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।’

তিনি বলেন, ’৭২, ’৯১ এবং ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুযোগ এলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় তা সম্ভব হয়নি। এবারের অভ্যুত্থান সেই সুযোগ আবার তৈরি করে দিয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তর পিছিয়ে যাবে কি না–এমন বিভ্রান্তি দূর করে তিনি বলেন, “সংসদ সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বাধা তৈরি হবে–এমন ধারণা মোটেই সঠিক নয়। সংসদ প্রথম দিন থেকেই নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক কার্যাবলি যেমন: সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট তৈরির কাজ করবে। তবে বিদ্যমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরিয়ে আনতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। এ জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবেন।’

আলী রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের অনেক মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, যা সাধারণ সংসদের এখতিয়ার নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন বা মৌলিক কাঠামো নীতির কারণে ভবিষ্যতে যেন কোনো সংস্কার আদালত কর্তৃক বাতিল না হয়, সে জন্য ত্রয়দশ সংসদকে ‘কনস্টিটিউ
য়েন্ট পাওয়ার’ বা গণপরিষদীয় ক্ষমতা দিতে হবে। এটি কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা নয়, বরং স্থায়ী গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।”
 

জুলাই জাতীয় সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার এবং জনগণের মধ্যে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, “এটি অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নিজস্ব এজেন্ডা নয়। ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে দীর্ঘ নয় মাস আলোচনার মাধ্যমে এই সনদ তৈরি হয়েছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে এটি ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ তবে রূপান্তরের সম্ভাবনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিদ্যমান সংবিধান ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের সুযোগ দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন তৈরিতে সহায়তা করেছে, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।”

প্রস্তাবিত গণভোটের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৭ বা ৮৫ সালের গণভোট ছিল ক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার। কিন্তু এবারের গণভোট কোনো ব্যক্তি বা সরকারের আস্থার ভোট নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলো যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে সাধারণ জনগণের সম্মতি আছে কি না–তা জানার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের বাইরেও জনগণের চূড়ান্ত রায় নিতেই এই গণভোট প্রয়োজন।

অধ্যাপক রীয়াজ রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও গণতন্ত্রায়নের দাবি জানিয়ে বলেন, বাইরে থেকে চাপ দিয়ে কোনো দলের সংস্কার সম্ভব নয়, এটি দলের ভেতর থেকে আসতে হবে। জুলাই বিপ্লবে নারীদের অসামান্য অবদান থাকলেও সংসদে তাদের আসন ১০০-তে উন্নীত করা এবং ৫ শতাংশ সরাসরি মনোনয়নের বিষয়ে অনেক দলই এখনও ঐকমত্যে আসেনি। তিনি দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কারের এই অঙ্গীকারগুলো পুনরায় স্পষ্টভাবে প্রকাশের আহ্বান জানান।

বিইআই-এর এই গোলটেবিল আলোচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য এবং সাবেক কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশে একটি সহিংসতামুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট