চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

ভোট নয়, ‘বাকযুদ্ধে’ ব্যস্ত জামায়াত-এনসিপি!

চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১১ দলীয় জোটে টানাপোড়েন

ভোট নয়, ‘বাকযুদ্ধে’ ব্যস্ত জামায়াত-এনসিপি!

তাসনীম হাসান

২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের অন্য আসনগুলোতে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা যেখানে দলবেঁধে প্রচারে ব্যস্ত, সেখানে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের চিত্রটা যেন একটু ভিন্ন। এই আসনে জোটের প্রার্থী এনসিপির চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি এখনও পুরোদমে জোটের প্রধান শরিক জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে পাননি। আদৌ পাবেন কিনা সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।

 

কারণ একটাই; এই আসনে জোট থেকে এনসিপির প্রার্থী মনোনয়ন পেলেও সেটি মেনে নিতে পারছেন না জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে দুই দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন, জড়িয়ে পড়েন ‘বাকযুদ্ধে’। একপর্যায়ে প্রতীক বরাদ্দের পর ২১ জানুয়ারি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন জামায়াতের প্রার্থী। যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলে আইনিভাবে নির্বাচন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর আর কোন সুযোগ নেই। ফলে ব্যালটে থাকছে এনসিপি ও জামায়াত- দুই দলের প্রতীকই।

 

আবু নাছের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও উত্তেজনা কমেনি। এনসিপির প্রার্থীকে ‘বয়কট’ করে বোয়ালখালীতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দুই দফা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ ও জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নগর ও বোয়ালখালীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে এনসিপি।

 

জামায়াতের নেতাকর্মীদের দাবি, বোয়ালখালীর সন্তান ও একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে আবু নাছের গত ১৫ মাসে এলাকায় চষে বেড়িয়েছেন। ৩০টিরও বেশি বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প করেছেন। সবমিলিয়ে এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। বিপরীতে এনসিপির প্রার্থী সাতকানিয়ার বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয়ভাবে কম পরিচিত- এমনও দাবি তাদের।

 

অন্যদিকে, এনসিপি নেতাকর্মীদের বক্তব্য, এনসিসি চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে শুধু এই আসনেই প্রার্থী দিয়েছে এবং জোটের সিদ্ধান্ত মেনে অন্য আসনগুলোতে প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু এরপরও এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। উল্টো বোয়ালখালীতে জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে মিছিল করা হচ্ছে, এনসিপি বয়কট স্লোগান দেওয়া হচ্ছে; যা জোটের ঐক্যের পরিপন্থী।

 

এমন টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া বোয়ালখালীর তরুণ মো. ওমর বিন নুরুল আবছারের মা রুবি আক্তার। গতকাল নির্বাচনী পদযাত্রায় বোয়ালখালীতে যান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় তারা শহীদ মো. ওমর বিন নুরুল আবছারের কবর জেয়ারত করেন। তখন আসিফ মাহমুদকে কাছে পেয়ে রুবি আক্তার আসনটির জোটের প্রার্থী নিয়ে বলেন, এখানে স্থানীয় মানুষের ভোট বেশি। স্থানীয় মানুষেরা চাইবে স্থানীয় মানুষকে ভোট দিতে। কোন কারণে যদি এই আসনটা হাতছাড়া হয়ে যায় আমাদের নিরাপত্তা দেবে কে?

 

তখন পাশে দাঁড়ানো এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, ‘আন্টি, ১১ দলীয় জোট যদি আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে কোনওভাবেই এই আসন হাতছাড়া হবে না।’ রুবি আক্তার তার কথার প্রতিউত্তরে বলেন, ‘জোট ঠিক আছে; কিন্তু এখানে স্থানীয় মানুষ অনেক বেশি। ১১ দলীয় জোটের ভোট হচ্ছে ২০ শতাংশ, স্থানীয় ভোট ৮০ শতাংশ। এখন আপনারা যখন দাঁড়াবেন আগে থেকে ঠিক করা দরকার ছিল। এখন কেউ তো চিনে না।’

 

তখন আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এখন তো আমরা মাঠে নেমে গেছি।’ তখন রুবি আক্তার বলেন, ‘তাহলে আমি বলি দুটোই থাক (জামায়াত-এনসিপির প্রার্থী)। আল্লাহ যাকে দেয় সেই হবে।’ তখন আসিফ মাহমুদ হাসতে হাসতে বলেন, ‘তাহলে কেউই হবে না।’

 

অবশ্য গতকাল এনসিপির পদযাত্রায় অংশ নিয়ে দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি বদরুল হক শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দিয়ে জোবাইরুল আরিফকে জয়ী করার আহ্বান জানিয়েছেন। ১১ দলীয় জোটের দুই প্রার্থীর ‘দ্বন্দ্ব’ যেন অনেকটাই নির্ভার আছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের মহানগর শাখার আহ্বাবায়ক এরশাদ উল্লাহ। তিনি ছাড়াও ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ এমদাদুল হক ও ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ নুরুল আলমও নির্বাচনের মাঠে আছেন।

 

এখন দেখার বিষয়, জোটভুক্ত দুই দলের নেতাকর্মীরা কি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে একজোট হবেন, নাকি আগের মতো সময় কাটাবেন ‘বাকযুদ্ধেই’!

 

পূর্বকোণ/ ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট