চট্টগ্রাম শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রামে হাজিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা : নগরীতে প্রচন্ড চাপ গ্রামে ফাঁকা
স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে লাইনে দাড়িঁয়ে অপেক্ষায় আছেন হজযাত্রীরা।

চট্টগ্রামে হাজিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা : নগরীতে প্রচণ্ড চাপ, গ্রামে ফাঁকা

ইমাম হোসাইন রাজু

২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

সকাল থেকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের করিডোরে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব সৈয়দ আহমদ। বাঁশখালী থেকে ভোরে রওনা হয়ে দুপুর গড়ালেও এখনো শেষ হয়নি তার হজের মেডিকেল পরীক্ষা। অথচ নিজ উপজেলাতেই এই সেবার সুযোগ থাকলেও তা জানতেন না তিনি। এমন তথ্য বিভ্রাট ও ‘একমুখী নিয়মের’ ফাঁদে পড়ে ২০২৬ সালের হজযাত্রীদের ভিড়ে উপচে পড়েছে চমেক হাসপাতাল।

 

সৈয়দ আহমদের মতো শুধু সঠিক তথ্য না জানার কারণে গ্রামাঞ্চল থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নগরে ছুটে আসছেন শত শত হজযাত্রী। সরকারি নির্দেশনায় জেলা উপজেলা পর্যায়ে একাধিক কেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও সঠিক তথ্য না পৌঁছানোয় সব চাপ পড়েছে চমেক হাসপাতালে। এতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মেডিকেল ফিটনেস সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চট্টগ্রামের হজযাত্রীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় অসুস্থ হচ্ছেন বয়োজ্যেষ্ঠ হজযাত্রীরা, ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ রোগীর সেবাও। আর সাধারণ রোগীর পাশাপাশি হজযাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রেফারেল হাসপাতালও।

 

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে হজ পালনের জন্য মোট ৭৬ হাজার ৫৮০ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে ৭২ হাজার ৩৪৪ জন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং ৪ হাজার ২৬০ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করবেন। এ বছর বাংলাদেশের জন্য মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জনের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, সব হজযাত্রীর জন্য মেডিকেল ফিটনেস সনদ বাধ্যতামূলক।

 

জানা গেছে, চমেক হাসপাতালে হাজিদের সুবিধার্থে বিশেষায়িত বুথ স্থাপন করা হয়েছে। হাসপাতালে দ্বিতীয় তলায় রক্ত পরীক্ষা ও ইসিজি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হাজিদের অতিরিক্ত চাপের কারণে বুথ বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হজযাত্রী সেবা পাচ্ছেন না, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

 

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বলেন, আমাদের এমনিতেই সাধারণ রোগী ও রেফারেল রোগীর চাপ রয়েছে। তার ওপর প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ হজযাত্রীর বাড়তি চাপ। আমরা হাজিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পৃথক কক্ষ খুলে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সর্বোচ্চ প্রস্তুতিও রয়েছে। কিন্তু চাপ বেশি হওয়ায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।

 

বিকল্প কেন্দ্র থাকলেও নেই ব্যবহার: সরকারি নির্দেশনায় চমেক হাসপাতালের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতাল এবং জেলার ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে।

 

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেখানে গত দুই দিনে ১০৪ ও ১০৬ জন হজযাত্রী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। সবমিলিয়ে হাসপাতালটিতে পাঁচ শতাধিক হজযাত্রীর পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। আর বিআইটিআইডি হাসপাতালে শুরু হলেও সেখানে মাত্র ৫০ জন পরীক্ষা করেছেন। বিপরীতে বেশ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখনো একজনও হজযাত্রী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি।

 

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম বলেন, আমরাও প্রতিদিন শতাধিক হজযাত্রীকে সেবা দিচ্ছি। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন, অথচ তারা চাইলে নিজ নিজ উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই সেবা নিতে পারতেন।

 

দুর্ভোগের কারণ অজ্ঞতা: একাধিক হাজির সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই জানেনই না- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও হাজিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যায়। পটিয়া থেকে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, কেউ যদি আগে জানাতো, তাহলে এত কষ্ট করে শহরে আসতে হতো না, নিজ এলাকায় পরীক্ষা করিয়ে নিতাম।

 

রফিকুল ইসলামের মতো অনেকেই শুধুমাত্র তথ্য না জানার কারণে নগরে এসে দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তিতে পড়ছেন।

 

হজযাত্রীদের অভিযোগ, হজ এজেন্সিগুলো স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। কেউ কেউ গ্রাম থেকেই হাজিদের শহরে নিয়ে আসছেন, অথচ উপজেলা পর্যায়েও এই সুবিধা রাখা আছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কিছু এজেন্সি নিজেদের ‘কাজ’ দেখাতে হাজিদের শহরে নিয়ে আসছে। ফলে এক হাসপাতালের ওপর চাপ বেড়েছে, অন্য হাসপাতালগুলো ব্যবহার হচ্ছে না।

 

জানতে চাইলে হজ এজেন্সি এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (হাব) চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান শরিয়ত উল্লাহ সহিদ বলেন, আগের বছরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সরকারি-বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানে উন্মুক্ত ছিল। যার যেখানে ইচ্ছে সেখানে পরীক্ষার সুযোগ ছিল। এ বছর শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করায় হজযাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

 

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে সাড়ে ছয় হাজার হজযাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে। চমেক হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বিআইটিআইডি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এই পরীক্ষা করার সুযোগ আছে। তবে হজযাত্রীরা বেশি করে চমেক হাসপাতালে চলে আসছেন। চাপ কমাতে অতিরিক্ত ১২/১৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট