
সরকারি চাকরির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা। অভিযুক্তের নাম রাজিব দে (৩৭)। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চকরিয়ায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
রাজিব দে চকরিয়া পৌরসভার ভরামুহুরী হিন্দুপাড়া এলাকার কানুরাম দে প্রকাশ কানু ড্রাইভারের বড় ছেলে। স্থানীয়দের কাছে ‘ভদ্র ও বিশ্বাসযোগ্য সরকারি কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচয়কেই পুঁজি করে নারী-পুরুষসহ অর্ধশতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে এই রাজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজিব প্রথমে স্বল্প পরিমাণ – এক বা দুই লাখ টাকা-‘হাওলাত’ হিসেবে নিতেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই তা ফেরত দিতেন। এতে দাতাদের মনে তার প্রতি গভীর বিশ্বাস তৈরি হতো। পরবর্তীতে উচ্চ সুদের প্রলোভন কিংবা জমি কেনা, ব্যবসায় লাভের কথা বলে একসঙ্গে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন। বিনিময়ে দাতাদের হাতে ব্যাংক চেক দিলেও সেগুলো পরবর্তীতে ডিজঅনার হয়।
এক ভুক্তভোগী সুরভী পাল (ছদ্মনাম) জানান, স্থানীয় একটি এনজিওতে দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে প্রায় ১০ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে রাজিব এক লাখ টাকা নিয়ে সময়মতো ফেরত দেয়ায় তার প্রতি আস্থা জন্মায়। পরে একই বিশ্বাসে এনজিওতে জমা পুরো ১০ লাখ টাকা রাজিবের হাতে তুলে দেন। এরপর থেকেই রাজিব নিখোঁজ।
আরেক ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলম জানান, পরিচয়ের সুবাদে তিনি রাজিবকে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দেন, যা ফেরতও পান। পরে রাজিব কম দামে জমি কেনার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা নেন এবং একটি ব্যাংক চেক দেন। কয়েক মাস পার হলেও টাকা বা জমির কোনো হদিস মেলেনি।
ভুক্তভোগীরা জানান, রাজিব শুধু সাধারণ মানুষ নয়, নিজের দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় মাছ, মাংস ও মুরগি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও নানা অজুহাতে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের কারণে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে সাহস পাচ্ছেন না।
রাজিবের প্রতারণায় বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কেউ ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, কারও সংসার ভাঙনের মুখে। অনেকে শেষ পর্যন্ত আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন।
চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইতোমধ্যে একাধিক ভুক্তভোগী চেক ডিজঅনার ও প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলায় আদালত রাজিব দে’র বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। পরোয়ানা জারির পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। গত তিন থেকে চার মাস ধরে তিনি কর্মস্থলেও অনুপস্থিত।
রাজিব দে’র বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাজিবের সঙ্গে তাদেরও কোনো যোগাযোগ নেই।
এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, রাজিবের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ও একাধিক মামলা হয়েছে বলে জেনেছি। তিনি কয়েক মাস ধরে অফিসে অনুপস্থিত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং তার বেতন-ভাতা ইতোমধ্যে বন্ধ রাখা হয়েছে।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আদালত কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থান শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূর্বকোণ/ইবনুর