
বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। সুজলা সুফলা শস্যশ্যমলা নদীমাতৃক এদেশে ষড়ঋতুর লীলাখেলা। কবির ভাষায়- ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে , পাবে নাকো তুমি-’। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ দেশের প্রাচীনতম শহর বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে অবস্থিত। সরকারি এই মেডিকেল কলেজ ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীনতম , দ্বিতীয় বৃহত্তম চিকিৎসা-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল, এবং অধুনা চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। উল্লেখ্য- এর ডিজাইন করেছিলেন গ্রিক স্থপতি স্যার আর্থার মিলার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল- বৃহত্তর চট্টগ্রামের একমাত্র একটি তৃতীয় পর্যায়ের রেফারেল হাসপাতাল। এটি প্রায় ৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ-সোনালি অতীত : ১৯০১ সাল- আন্দরকিল্লায় পাহাড়ের উপর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। ১৯২৭ সাল-দেশের চিকিৎসা শিক্ষার দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুল। চার বৎসরের কোর্স সমাপনান্তে প্রদান করা হতো এল.এম.এফ ডিগ্রী। ১৯৫৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই কলেজের উদ্বোধন করেন। ১৯৫৮ সালÑ প্রথম ছাত্রসংসদ গঠিত হয়। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হিসেবে সেবা প্রদান করত। ১৯৬৯ সালেÑ বর্তমান সাততলা ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ওই বছরই এটি সেখানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯০ সালের ৫ জানুয়ারিÑ ডেন্টাল ইউনিট চালু এবং ব্যাচেলর অব্ ডেন্টাল সার্জারী (বিডিএস) প্রোগ্রাম শুরু । ১৯৯২- সালে অ্যানেসথেসিয়া, শিশু-স্বাস্থ্য এবং স্ত্রী রোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ ¯œাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্স চালু। ২০০২ সালে বিভিন্ন বিষয়ে এম.এস, এম.ডি, এম.ফিল, ডিপ্লোমা ও এম.পি.এইচ সহ ¯স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়। এই মেডিকেল কলেজ দেশের বহু ধ্রুবতারা চিকিৎসা-বিজ্ঞানী শিক্ষকদের মেডিকেল শিক্ষকতায় ধন্য হয়েছে।
কোর্স অনুষদ বিভাগ ও সংযুক্ত হাসপাতাল : এই মহাবিদ্যালয়ে ইন্-সার্ভিস টেনিং-সহ স্নাতক পর্যায়ের ৫ বছর মেয়াদি এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে ৪০টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষাক্রম চালু আছে, বিভাগ রয়েছে ৫৮টি । বলা যায় এই মহাবিদ্যালয় জননী বিগত সাত দশকের ইতিহাসে হাজার হাজার এমবিবিএসস্নাতক, নার্স, ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক তৈরি করেছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এই কলেজের সংযুক্ত হাসপাতাল। এটি উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ব্যবহারিক শিক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্র [৯]। হাসপাতালটি বাংলাদেশ কলেজ অব্ ফিজিশিয়ানস্ এন্ড সার্জনস্ ও চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজসহ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি নার্সিং কলেজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ।
১৯৫৯ সাল- সার্জারী, গাইনী ও রক্ত সঞ্চালন বিভাগ সহ ১২০ বেড দিয়ে যাত্রা শুরু। পরে এটি ধাপে ধাপে উন্নীত হয়, যেমন-১৯৬৯ সালে ৫০০ শয্যা, ১৯৯৬ সালে ৭০০ শয্যা, ২০০১ সালে ১০১০ শয্যা। বর্তমানে হাসপাতালটি ২২০০ শয্যাবিশিষ্ট।
গবেষণা কার্যক্রম : ম্যালেরিয়া, সাপের বিষ, বাংলাদেশের শিশু : ভিটামিন-ডি পরিপ্রেক্ষিত সহ বহু উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার এখানের চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের স্বীকৃত অবদান। কোন কোন তথ্যে উল্লেখ আছে-এ প্রতিষ্টানে পরিচালিত গবেষণা কর্মের প্রায় ৬০১টি গবেষণাকাজ ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যার সাইটেশন সংখ্যা প্রায় ৭০৪০ (সূত্র-পাব্ মেড, স্কোপাস, গুগল স্কলার)। এখানকার বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার দীপ্ত স্বাক্ষরÑ জার্নাল অব্ চিটাগাং মেডিকেল কলেজ টিচারস্ এসোসিয়েসান (জেসিএমসিটিএ)।
অবকাঠামো : কলেজের একাডেমিক ভবনে ৫টি লেকচার গ্যালারি (সালাম, বরকত, সুতপা, জব্বার ও রফিক লেকচার গ্যালারি), ৩০টি টিউটোরিয়াল রুম, ২টি শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষ, ৭টি ল্যাবরেটরি এবং ১টি ফরেনসিক মর্গ রয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল ভবনে রয়েছে ৩৭টি ওয়ার্ড। কলেজ ক্যাম্পাসে ১০ তলা বিশিষ্ট একটি নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। রয়েছে স্টুডেন্ট ওয়ার্ড, শহীদ মিনার , খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম শাহ আলমের নামে ‘শাহ আলম বীর উত্তম মিলনায়তন’,‘ ডা. মিলন মুক্তমঞ্চ’।
অন্যান্য : ভেনম রিসার্চ সেন্টার পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র , কেন্দ্রীয় মসজিদ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, সিএমসি ক্যাফে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সমূহের মধ্যে অন্যতম । লাইব্রেরি ও ছাত্রাবাস : আন্ডার গ্রাজুয়েট ও পোস্টগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক পৃথক লাইব্রেরি, বোনস্ লাইব্রেরি ।, সাহিত্য লাইব্রেরি ও স্বাধীনতা গ্যালারি । পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্যÑপ্রধান ছাত্রাবাস, হাফিজুল্লাহ বশির শাওন ছাত্রাবাস এবং লুৎফুস সালাম ছাত্রাবাস। ছাত্রীদের জন্য-কান্তা ছাত্র নিবাস ও দিলরুবা ছাত্রাবাস। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের জন্য পৃথকভাবে-ডা. মিজান ইন্টার্ন হোস্টেল (পুরুষ) এবং ডা. জান্নাত মহিলা ইন্টার্ন হোস্টেল
সংগঠনসহ শিক্ষা কার্যক্রম : ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ (চমেকসু)’, ‘কলেজ শিক্ষক সমিতি’, শিক্ষার্থীদের ‘বিতর্ক ক্লাব’ ও ‘রিসার্চ ক্লাব’এবং সেবামূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে সন্ধানী ইউনিট এই কলেজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
কলেজে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন, সিএমসি ডে, বাণী অর্চনা, পহেলা বৈশাখ উদযাপন সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তঃক্রীড়া, ক্রিকেট, ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট, এবং বার্ষিক শিক্ষা সফর আয়োজিত হয় । ‘প্রাক্তন ছাত্র সমিতি’ এবারে অনুষ্ঠিত রি-ইউনিয়নের বিপুল কর্মযজ্ঞের মধ্যে ‘স্বর্ণবৃক্ষের সোনালি নাম’ অ্যালবামে প্রয়াস নিয়েছে কলেজের প্রতিষ্টাকালিন প্রথম ব্যাচ ১৯৫৮-১৯৫৮ সেশন থেকে ২০২৪-২০২৫ পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর নাম লিপিবদ্ধ করার।
উপসংহার : ৫২’র মহান ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ থেকে ৭১’র গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের ভ‚মিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী। বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম শাহ আলম ছিলেন এই মেডিকেল কলেজের ছাত্র। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র জসিম, জাকির, সাদেকের আত্মত্যাগে এই মেডিকেল কলেজ মহীয়ান হয়েছে।
‘There can be no better reward or stronger incentive for medical education than developing the attitude of humanity, the follower of an ethical code in ‘tomorrow’s doctors.’ সত্তর বছরের গৌরব ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে, ধরিত্রীর বুকে এই মহাবিদ্যালয় আজ চিকিৎসা-শিক্ষা,মানবিক চিকিৎসা-সেবায় সমুজ্জ্বল চিকিৎসা-বিজ্ঞানের এক বাতিঘর ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পঞ্চম পূর্নমিলনী মিলনমেলায় আনন্দ-আবেগে আমাদের গীতিধ্বনি- ‘উই আর সিএমসিয়ান, উই আর সিএমসিয়ান / ইউ এন্ড মী, হী এন্ড শী, সিএমসিয়ান, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ক্যাম্পাসে হাসপাতালে আমরা সিএমসিয়ান। এখানে আকাশতলে কতো তারা ফুল ফোটে শতদলে / এক ডাক্তারী জীবনের ঐকতান। উই আর সিএমসিয়ান, আমরা সিএমসিয়ান’।
লেখক : এমবিবিএস-২০তম ব্যাচ চমেক
পূর্বকোণ/ইবনুর