
দেশে মজুত থাকা এবং প্রতিনিয়ত আমদানি হওয়া স্বর্ণের বড় একটি অংশই অবৈধ পথে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। তিনি অভিযোগ করেন, এই অবৈধ আমদানি প্রক্রিয়ায় এনবিআরের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআরের নিয়মিত আয়োজন ‘মিট দ্য বিজনেস’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খানের নেতৃত্বে স্বর্ণ ও গহনা খাতের ব্যবসায়ীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, স্বর্ণ ও গহনা খাত দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান, দুর্বল কমপ্লায়েন্স এবং নীতিগত ঘাটতিতে জর্জরিত। এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এনবিআর কাজ করছে বলে জানান তিনি।
আবদুর রহমান খান বলেন, যারা প্রকৃত অর্থে বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি করতে চান, তাদের সে সুযোগ দেওয়া উচিত। বৈধ আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলে এনবিআর প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসার প্রকৃত লেনদেন সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে টার্নওভার ট্যাক্সের প্রয়োজন হবে না। বরং প্রকৃত মুনাফার ভিত্তিতে কর আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার।
স্বর্ণ চোরাচালানকে কেন্দ্র করে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এটি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি কমানো এবং খাতটির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করেন যে দেশে অবৈধ পথে স্বর্ণ আসছে। তবে তারা এই অপবাদ ও জটিলতা থেকে মুক্তি চান।
ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানির পথ সহজ করা হলে অবৈধ বাণিজ্য কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে। তারা চোরাচালানের বদলে ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতায় এসে বৈধভাবে ব্যবসা করতে চান। এ লক্ষ্যে আমদানি সহজ করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে বাজুস।
বাজুসের এক নেতা জানান, অতীতে স্বর্ণ আমদানির জন্য সরকার ১৮টি লাইসেন্স দিয়েছিল, যার মধ্যে অন্তত ১০ জন প্রকৃত স্বর্ণ ব্যবসায়ী নন। গহনা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তি, এমনকি একজন ক্রিকেটারকেও লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে চোরাকারবারিরা আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে, অথচ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তাই সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ব্যাংকগুলো স্বর্ণ ও গহনা খাতে ঋণ দিতে অনাগ্রহী, যা ব্যবসা পরিচালনায় বড় বাধা। পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশ বা সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ের তুলনায় দেশের বাজারে ভরিতে অন্তত ৩০ হাজার টাকা বেশি দাম পড়ে। ফলে অনেক সময় অবৈধ উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।
স্বর্ণ ব্যবসায় বিপুল মূলধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তারা শুল্ক কাঠামো সহজ করার আহ্বান জানান। বর্তমানে স্বর্ণের দাম ৯০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা হলেও আমদানিতে প্রতিবার মাত্র দুই হাজার টাকা শুল্ক নির্ধারিত রয়েছে—যা একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থাতেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর প্রদান সহজ করতে এবং সঠিক তথ্য জমা নিশ্চিত করতে স্বর্ণ ও গহনা খাতের জন্য আলাদা একটি ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
পূর্বকোণ/এএইচসি/পারভেজ