
বায়েজিদ এলাকার ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুলকে এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। গত সোমবার বিকেলে ঢাকার গুলশানের দুই নম্বর রোডের ৭৯ নম্বর বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে শিহাব উদ্দিন নামে আরো এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বায়েজিদ এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ আর ছিনতাইসহ তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। তাকে সুনির্দিষ্ট কোন অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা জানাতে আজ (বুধবার) বিকেল তিনটায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে নগর পুলিশ। নগর পুলিশের জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৪ জানুয়ারি নগরের আতুরার ডিপো এলাকা চারজন অস্ত্রধারী যুবক হাজারী গলির তিন স্বর্ণের কারিগরের কাছ থেকে ৩৫টি (৩৫০ ভরি) স্বর্ণের বার ছিনতাই করে। পুলিশ ২৯ টি (২৯০ ভরি) স্বর্ণের বার উদ্ধার করেছে। ছয়টি (৬০ ভরি) স্বর্ণের বার ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয় লোকজন জানান, ‘যে এলাকায় স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে সেটি সাইফুলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। তাকে না জানিয়ে ওই এলাকায় এ ধরনের ঘটনা সংগঠিত হওয়ার কথা নয়।’
সাইফুলের ছোট ভাই শাহিন জানান, ১৫/২০ দিন আগে বাথরুমে পড়ে আহত হয় সাইফুল। চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। সোমবার নগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে এবং শিহাব উদ্দিন নামে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি চালককে ডিবি নিয়ে গিয়েছিলো। পরে সাইফুলের বাবার জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। স্বর্ণ ছিনতাইয়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে শাহিন জানান, কয়দিন ধরে আমার ভাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। আমাদের বারবার বলছিলো তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে। সাইফুল রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করেন তার ছোট ভাই শাহীন। সাইফুল ছাত্রদলের নগর শাখার সহ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নানা ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তার ছোট ভাই শাহিনের দাবি- বহিষ্কারের দুই মাসের মাথায় গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর সাইফুলের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দল। তবে নগর ছাত্রদলের আহŸায়ক সাইফুল আলম জানান, বেলায়েত হোসেন বুলু ও গাজী সিরাজ কমিটিতে ছিলেন সাইফুল। বর্তমানে তিনি দলের কোন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই।
একই দিনে তিনজন অপহরণ: একই দিনে তিনজনকে অপহরণ করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির নেপথ্যে ছিলেন সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুল। মুক্তিপণ দিতে রাজী না হলে তিনজনকে মেরে ফেলার জন্য অনুসারীদের মুঠোফোন নির্দেশ দেন সাইফুল। অপহরণের ঘটনায় সাইফুলের ভাই ফাহিমও জড়িত ছিল। অপহরণের শিকার তিনজন হলেন পুরোহিত কাজল দে প্রকাশ কেশব মিত্র দাস (৪৩), সেবক রুবেল রুদ্র (৪২) এবং বায়েজিদ থানার হিলভিউ এলাকার বাসিন্দা সমির দাস (৪৫)। অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবির ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছরের ২৫ জানুয়ারি। এ ঘটনায় বায়েজিদ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন রুবেল রুদ্র। মামলায় আটজনকে এজাহারভুক্ত ও ১৫/২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার চারজন ছাড়া পলাতক চারজন হলেন সাইফুলের ছোট ভাই ফাহিম, সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন টিংকু, মো. মিঠু ও করম আলী।
তিন সহোদর সুবজ-সাইফুল-ফাহিম : কথায় কথায় মানুষকে মারধর, অপহরণ কিংবা কোপানো যেন তাদের নিত্যদিনের কাজ। ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ব্যানারে নানা অপরাধে জড়ানোর কারণে দুই ভাইকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড কিন্তু থেমে ছিলোনা। নগরের ষোলশহর থেকে বায়েজিদ অক্সিজেন পর্যন্ত ছড়িয়েছে সাইফুলের আধিপত্য।
পুলিশের ওপর হামলা: এর আগে ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর অনুসারীদের নিয়ে এক পুলিশ সস্যকে আহত ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় বায়েজিদ থানায় দায়ের হওয়া দ্রুত বিচার আইনের সবুজ-সাইফুলকে দুজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। ওইদিন সাইফুল ও শান্তিনগর এলাকার ঝন্টু ও কাশেম গ্রুপের মধ্যে এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ হয়। পুলিশের ওপর হামলা ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের অপরাধে মামলাটি দায়ের করে বায়েজিদ থানার এসআই নাছির উদ্দিন। সাইফুল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নগর শাখার সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক ও সবুজ পাঁচলাইশ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহŸায়ক ছিল। ১২ অক্টোবরের সংঘর্ষের ঘটনার পরদিন দুই ভাইকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বড় ভাই সবুজ ও সাইফুলকে অনুসরণ করে পিছিয়ে নেই ছোট ভাই ফাহিম। বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ থানায় সবুজের বিরুদ্ধে ১৮টি, সাইফুলের বিরুদ্ধে ২৯টি ও ফাহিমের বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে।
২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট বায়েজিদ হিলভিউ আবাসিক এলাকায় দুই নম্বর রোডে দিনে-দুপুরে ইমরান হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে আহত করে সাইফুল ও তার ভাই ফাহিম। ইমরানের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সাইফুলের অনুসারীদের বিরুদ্ধে তার বন্ধু মনছুর বায়েজিদ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ইমরানকে সাক্ষী করা হয়। এতে সাইফুল ক্ষিপ্ত হন।
স্থানীয় লোকজন জানান, বায়েজিদ বার্মা কলোনী, হিলভিউ, রংপুর কলোনী, ফরেস্ট গেট, মান্দার টিলা, আমিন কলোনী, আলিনগর, নবীনগরসহ পুরো এলাকা অনুসারীদের নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন তিন সহোদর।
পূর্বকোণ/ইবনুর